‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪৬ ।। আমার বাবা ভাল

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪৬ ।। আমার বাবা ভাল

 ।। আমার বাবা ভাল।।

উৎসর্গ
পৃথিবীর সব বকুলের প্রতি—
যারা পৃথিবীর সব বিচার ভুলে
আজও বলে, “আমার বাবা ভালো।”

আমার বাবা ভাল

বরিশালের উজিরপুরের একটি ছোট বাজার। সকাল এখনও পুরোপুরি জমে ওঠেনি, কিন্তু চায়ের দোকানগুলোতে মানুষের ভিড় বাড়ছে। কেউ হাতে চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ বাজারের ব্যাগ হাতে দোকান থেকে দোকানে ঘুরছে। মাছওয়ালারা মাছ সাজাচ্ছে, সবজিওয়ালারা ক্রেতা ডাকছে, রিকশা আর ভ্যানগাড়ি ধীরে ধীরে বাজারের সরু রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে। গ্রামের মানুষজনের চেনা ব্যস্ততা, গল্প আর কৌতূহলে বাজারটা ক্রমেই সরব হয়ে উঠছে।

হঠাৎ বাজারের এক পাশে একটা অস্বাভাবিক ভিড় জমে যায়। কৌতূহলী মানুষজন একজন আরেকজনকে ঠেলে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কেউ দূর থেকে উঁকি দিচ্ছে, কেউ মোবাইল বের করে ছবি তুলছে। কারও মুখে রাগ, কারও চোখে কৌতূহল, আবার কারও মুখে দেখা যাচ্ছে মায়া। মাঝখানে একটি খুঁটির সঙ্গে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে একজন মানুষ। সারারাত এমন অবস্থায় থাকার ক্লান্তি তার মুখে স্পষ্ট।

ভিড়ের মধ্যে কেউ বলছে, লোকটি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। কেউ বলছে, আগেও নাকি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। আবার কেউ রাগের সঙ্গে বলছে, পুলিশে দেওয়ার আগে তাকে ভালো করে শাস্তি দেওয়া দরকার। কিন্তু সবার কথা একরকম নয়। কয়েকজন মানুষ বারবার বলছে, অপরাধ করে থাকলে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়াই উচিত। কেউ কেউ বলছে,

—চুরি করে থাকলে পুলিশে দেন। এভাবে মানুষকে মারধর করা ঠিক না।

—কিন্তু লোকটা নাকি আগেও এমন করেছে।

—অভিযোগ থাকলেই তো কাউকে মেরে ফেলা যায় না।

—পুলিশের হাতে তুলে দেন, আইন যা করার করবে।

এমন সময় ভিড়ের পেছন থেকে সাত-আট বছরের একটি মেয়ে ধীরে ধীরে সামনে আসে। তার নাম বকুল। গায়ে পুরোনো জামা, চুল এলোমেলো, চোখেমুখে আতঙ্ক। এত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও তার চোখ শুধু খুঁজছে একজনকেই। হঠাৎ খুঁটির পাশে বসে থাকা মানুষটিকে দেখতে পেয়ে সে থেমে যায়। তারপর ছুটে গিয়ে দাঁড়ায় তার সামনে।

—বাবা!

লোকটি মাথা তুলে তাকায়। মেয়েকে দেখে তার মুখের কঠিন ভাবটা মুহূর্তে নরম হয়ে আসে।

—বকুল! তুই এখানে কেন মা?

বকুল বাবার বাঁধা হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে পানি জমে ওঠে।

—তোমাকে বেঁধে রেখেছে কেন?

বাবা মেয়ের চোখের দিকে তাকাতে পারে না।

—তুই বাড়ি যা মা।

—না। তোমাকে রেখে আমি যাব না।

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে। একটু আগে যারা উত্তেজিত হয়ে নানা কথা বলছিল, তাদের কয়েকজনের মুখও এখন বদলে যাচ্ছে।

একজন বয়স্ক মানুষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,

—আহা, মেয়েটার কী দোষ? বাবাকে এমন অবস্থায় দেখে ওর মনটা কী করছে কে জানে!

আরেকজন বলেন,

—বাবা অপরাধী হলেও মেয়েটা তো অপরাধী না।

পাশের চায়ের দোকানের একজন বনরুটি আর এক কাপ চা এনে বকুলের হাতে দিয়ে বলেন,

—মা, বাবাকে খাওয়াও।

বকুল রুটিটা হাতে নেয়। খুব যত্ন করে ছোট ছোট টুকরো করে। তারপর এক টুকরো রুটি চায়ে ভিজিয়ে বাবার মুখের কাছে ধরে।

—বাবা, খাও।

লোকটি চারপাশে তাকায়। এত মানুষের সামনে নিজের অপমান যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু মেয়ের হাতটা তার মুখের সামনে এগিয়ে আছে। সে ধীরে ধীরে রুটিটা মুখে নেয়।

বকুল আবার রুটি ভিজিয়ে বাবার মুখের কাছে ধরে।

—আরেকটা খাও।

বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলেন,

—তুই খাসনি?

—না।

—কেন?

—আগে তুমি খাও।

লোকটির চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। বকুল অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকায়।

—বাবা, তুমি কাঁদছ কেন?

—কিছু না মা।

—তোমার ব্যথা করছে?

—না।

বকুল বাবার গালে হাত রাখে। তার ছোট্ট হাতের স্পর্শে লোকটি চোখ বন্ধ করে ফেলে।

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলেন,

—মেয়েটা বাবাকে কত ভালোবাসে দেখছেন? মানুষের কী অবস্থা হয়েছে, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

আরেকজন পুরুষ নিচু গলায় বলেন,

—বাবা-মেয়ের সম্পর্কটা এমনই। ভুল করলেও সন্তান বাবাকে বাবা হিসেবেই দেখে।

বকুল আবার রুটি চায়ে ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দেয়। তারপর হঠাৎ বলে,

—বাবা, তুমি ভালো বাবা।

লোকটি চমকে মেয়ের দিকে তাকায়।

—কে বলেছে আমি ভালো?

বকুল সরল চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,

—কেউ বলেনি।

—তাহলে জানলি কীভাবে?

বকুল একটু ভাবে। তারপর ধীরে ধীরে বলে,

—তুমি রাতে আমাকে কম্বল দিয়ে ঘুম পাড়াও।

লোকটির চোখ আবার ভিজে ওঠে।

বকুল বলতে থাকে,

—আমি অসুস্থ হলে তুমি আমার মাথায় পানি দাও। আমি স্কুলে গেলে তুমি রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকো। আমার জুতা ছিঁড়ে গেলে তুমি নতুন জুতা কিনে দাও।

বাবা এবার আর মেয়ের দিকে তাকাতে পারে না। মাথা নিচু করে বসে থাকে।

বকুল বাবার চোখের পানি হাত দিয়ে মুছে দেয়।

—কাঁদবে না বাবা।

—কেন?

—মানুষ দেখছে।

ভিড়ের মধ্যে কয়েকজন মানুষ এবার মুখ ঘুরিয়ে নেয়। যে মানুষগুলো কিছুক্ষণ আগেও লোকটির বিরুদ্ধে কঠিন কথা বলছিল, তাদের অনেকেই আর কিছু বলছে না।

একজন যুবক ধীরে বলে ওঠে,

—অভিযোগ সত্য হলে পুলিশে দেন। কিন্তু মেয়েটার সামনে আর মারধর করবেন না। ওর মনে সারাজীবনের দাগ হয়ে যাবে।

আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে বলেন,

—ঠিক কথা। আইন নিজের হাতে নেওয়া উচিত না।

বাজারের সেই উত্তেজনা ধীরে ধীরে কমে আসে। মানুষের চোখ এখন লোকটির চেয়ে বেশি আটকে আছে ছোট্ট বকুলের দিকে। সে তখনও বাবাকে রুটি খাওয়াচ্ছে, যেন পৃথিবীতে আর কোনো মানুষ নেই, কোনো অভিযোগ নেই, কোনো বিচার নেই—আছে শুধু তার বাবা।

পরে প্রশাসনের লোকজন আসে। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে। বাবাকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বকুলের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার কথাও বলা হয়। তার মায়ের জন্য কাজের ব্যবস্থা করার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়।

বকুল এসবের কিছুই বোঝে না। সে শুধু বাবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।

একসময় বাবার হাতের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। লোকটি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। এতক্ষণ বসে থাকার কারণে তার পা কাঁপছে। বকুল সঙ্গে সঙ্গে বাবার হাত ধরে ফেলে।

—চলো বাবা।

লোকটি মেয়ের মাথায় হাত রাখে।

—চল মা।

দুজন ধীরে ধীরে বাজারের ভিড় পেরিয়ে হাঁটতে শুরু করে। কয়েকজন মানুষ তাদের চলে যাওয়া দেখে থাকে। কেউ কিছু বলে না। শুধু চায়ের দোকানের সেই মানুষটি দূর থেকে তাকিয়ে থাকে, যার দেওয়া এক কাপ চা আর বনরুটি দিয়ে বকুল সেদিন বাবাকে খাইয়েছিল।

বাজার আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। মাছের ডাক, সবজির হাঁক, রিকশার ঘণ্টা—সব আগের মতো শোনা যায়। কিন্তু যারা ঘটনাটি দেখেছে, তাদের মনে থেকে যায় ছোট্ট বকুলের মুখ আর তার সেই সহজ বিশ্বাস।

বকুলের কাছে বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো কাগজ নেই, কোনো সাক্ষী নেই, কোনো আদালত নেই। তার কাছে আছে শুধু কিছু ছোট ছোট স্মৃতি—রাতে কম্বল দিয়ে ঘুম পাড়ানো, অসুস্থ হলে মাথায় পানি দেওয়া, স্কুলের পথে দাঁড়িয়ে থাকা, ছেঁড়া জুতার বদলে নতুন জুতা কিনে দেওয়া।

বড়দের পৃথিবীতে একজন মানুষকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু একটি শিশুর পৃথিবীতে কখনো কখনো উত্তরটা খুব সহজ।

বকুল বাবার হাত শক্ত করে ধরে হাঁটতে হাঁটতে আবার বলে,

—বাবা, তুমি ভালো।

লোকটি এবার কিছু বলে না। শুধু মেয়ের হাতটা আরও শক্ত করে ধরে।

আর বকুলের ছোট্ট হাতের মুঠোয় তখন তার বাবার পুরো পৃথিবীটা যেন ধরা পড়ে থাকে।

লন্ডন, ১ অক্টোবর, ২০২৬