‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

দেশে সেপ্টেম্বরে ৭১ অজ্ঞাত লাশ, কারাগারে ২৪ মৃত্যু—মব সহিংসতা ও সীমান্ত নিয়েও উদ্বেগ

দেশে সেপ্টেম্বরে ৭১ অজ্ঞাত লাশ, কারাগারে ২৪ মৃত্যু—মব সহিংসতা ও সীমান্ত নিয়েও উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১ অক্টোবর:

এক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৭১টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার, কারা হেফাজতে ২৪ জনের মৃত্যু, মব সহিংসতায় ২৩ জন নিহত এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় ৩৮৪ জন আহত—সেপ্টেম্বর মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতির এমন একটি চিত্র তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে সাংবাদিক, নারী ও শিশু এবং সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনাও উঠে এসেছে।

এমএসএফের হিসাবে, সেপ্টেম্বরে উদ্ধার হওয়া ৭১টি অজ্ঞাতনামা লাশের মধ্যে ৫৫টি পুরুষের এবং ১৫টি নারীর। একটি লাশের বয়স ও লিঙ্গ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব লাশের বেশির ভাগ নদী, সড়ক, রেললাইন, ফসলি জমি বা পরিত্যক্ত স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। কয়েকটি লাশ গলা কাটা, বস্তাবন্দী, হাত-পা বাঁধা বা রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে। তবে প্রতিটি মৃত্যুর কারণ ও দায় নির্ধারণ তদন্তসাপেক্ষ বিষয়।

কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা আগস্টের ৯ থেকে সেপ্টেম্বরে বেড়ে ২৪ হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসে মৃত্যু বেড়েছে ১৫টি। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে একজন নারীর মৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে এমএসএফ। সেপ্টেম্বরের আগে আগস্টে কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ৯ ছিল বলে আগের মাসের পর্যবেক্ষণেও উল্লেখ করা হয়েছিল।

মব সহিংসতার অন্তত ৬৫টি ঘটনায় সেপ্টেম্বরে ২৩ জন নিহত এবং ৭৪ জন আহত হয়েছেন। এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুরি, ডাকাতি, জমি ও অর্থনৈতিক বিরোধ, বাকবিতণ্ডা এবং যৌন সহিংসতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনার উল্লেখযোগ্য অংশ ঘটেছে। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগের বিচার আদালতের পরিবর্তে সংঘবদ্ধ জনতার হাতে চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতায় সেপ্টেম্বরে ৩৮৪ জন আহত এবং অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। অজ্ঞাত হামলায় আরও সাতজন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে এমএসএফ।

সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। সেপ্টেম্বরে ২৮ জন সাংবাদিক হামলা বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৯ জন আইনি হয়রানির মুখে পড়েছেন। ডিজিটাল বা সাইবার আইনে মামলার সংখ্যা আগস্টের ৩টি থেকে বেড়ে ৮টি এবং গ্রেপ্তার ৩ থেকে বেড়ে ৮ জন হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগের তথ্য রয়েছে। আগস্টে একটি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা নথিভুক্ত হলেও সেপ্টেম্বরে এমন ঘটনা বেড়ে ১০টিতে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া একটি জাতিগত নির্যাতনের ঘটনাও নথিভুক্ত করার কথা জানিয়েছে এমএসএফ।

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার সংখ্যাও বেড়েছে। আগস্টের ৩২৭টি ঘটনার বিপরীতে সেপ্টেম্বরে নথিভুক্ত ঘটনা দাঁড়িয়েছে ৩৫৪টিতে। ধর্ষণ ও হত্যা ৫ থেকে বেড়ে ১০টি, ধর্ষণচেষ্টা ২১ থেকে ৩৬টি, শারীরিক নির্যাতন ৪০ থেকে ৫২টি এবং অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা ১৪ থেকে ২৭টিতে পৌঁছেছে।

সীমান্ত পরিস্থিতিও এমএসএফের পর্যবেক্ষণে এসেছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত বা আহত হওয়া, আটক এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর বা ‘পুশ-ইন’-এর চেষ্টার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে একজন বাংলাদেশি আহত হওয়ার তথ্যও রয়েছে।

মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সেপ্টেম্বরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নতুন আলোচনা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের কয়েকটি নতুন আইনি পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মতে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং র‍্যাবের পরিবর্তে নতুন বিশেষ বাহিনী গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত আইনি পরিবর্তনগুলো আগের কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করেছে। এগুলো হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মূল্যায়ন; বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান বা সংশ্লিষ্ট আইনের পূর্ণাঙ্গ সরকারি ব্যাখ্যাকে এর সঙ্গে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের এমএসএফের তথ্য বলছে, মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছু সূচকে উন্নতি থাকলেও অজ্ঞাতনামা লাশ, কারা হেফাজতে মৃত্যু, মব সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিংসতা, সাংবাদিকদের আইনি হয়রানি, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং সীমান্তে প্রাণহানির মতো বিষয়গুলো এখনো বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে আছে। তবে এমএসএফের পরিসংখ্যান গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি; এগুলোকে সরকারি পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, মাসিক নথিভুক্ত ঘটনার একটি মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ হিসেবে দেখা উচিত।