মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ শীর্ষ বেসরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের স্ত্রীকে মারার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে

মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ শীর্ষ বেসরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের স্ত্রীকে মারার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে

লন্ডন, ২ এপ্রিল: ইউএই-তে ব্যবহৃত কিছু পাঠ্যবইয়ে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ‘নারীদের কীভাবে আঘাত করতে হয়’—তা শেখানো হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে

ব্রিটিশ শিক্ষার গৌরবময় প্রতীক হিসেবে পরিচিত হ্যারো স্কুলের রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন নানা ঐতিহ্য—খড়ের টুপি, কালো টেইলকোট, এমনকি নিজস্ব প্রাচীন শব্দভাণ্ডার, যেখানে “beaks” মানে শিক্ষক এবং “the ducker” মানে সুইমিং পুল।

কিন্তু খুব শিগগিরই তাদের নতুন কিছু বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। স্যার উইনস্টন চার্চিলের এই প্রাক্তন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এ গ্রীষ্মে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) দুটি নতুন স্কুল চালু করতে যাচ্ছে, যেখানে মুসলিম শিক্ষার্থীরা কোরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি স্ত্রীকে মারধরের বিষয়েও শিক্ষা পাবে।

দ্য টেলিগ্রাফ কয়েক মাস ধরে তদন্ত করে দেখেছে, মধ্যপ্রাচ্যে পরিচালিত যুক্তরাজ্যের শীর্ষ বেসরকারি স্কুলগুলোতে শিশুদের কী শেখানো হচ্ছে। পাঠ্যবই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্রিটিশ সংস্কৃতির আবরণে থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ‘অবাধ্য’ স্ত্রীদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, তা শেখানো হচ্ছে।

একটি বইয়ের অধ্যায়ে শিরোনাম রয়েছে: “প্রথম: ভালোভাবে উপদেশ দেওয়া”, “দ্বিতীয়: একসঙ্গে শয্যা ভাগ করতে অস্বীকৃতি”, এবং “তৃতীয় ধাপ: হালকা প্রহার”। সেখানে বলা হয়েছে, শেষ ধাপটি হলো “সংস্কারের উদ্দেশ্যে প্রহার করা”।

বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে: “এর উদ্দেশ্য হলো দাম্পত্য জীবন ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করা এবং পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামাজিক ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা। স্বামী স্ত্রীকে চাবুক বা লাঠি দিয়ে বা মুখে আঘাত করতে পারবে না। বরং সে মিসওয়াক (দাঁত পরিষ্কারের ছোট কাঠি) বা হালকা রুমাল ব্যবহার করবে।”

এই ‘স্ত্রীকে মারধর’ বিষয়ক পাঠ কেবল মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য, যদিও প্রবাসী শিক্ষার্থীদের জন্যও ইউএই সরকারের নির্ধারিত নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক। স্কুলে ভর্তির সময় পরিবারের পক্ষ থেকে সন্তানের জাতীয়তা ও ধর্ম সম্পর্কে তথ্য দিতে হয়, এবং রাষ্ট্রনির্ধারিত ইসলামি শিক্ষার জন্য মুসলিম ও আরব শিক্ষার্থীদের আলাদা করা হয়।

শিক্ষার্থীদের আরও শেখানো হয়, স্বামীর ‘অসদাচরণ’ (যেমন নির্যাতন) হলে কীভাবে আচরণ করতে হবে। তবে সেখানে বলা হয়েছে, “যদি কোনো স্ত্রী স্বামীর পক্ষ থেকে নিষ্ঠুরতা বা বিরূপ আচরণের আশঙ্কা করে, তাহলে তারা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছালে কোনো দোষ নেই—এটাই উত্তম।”

একটি অনুশীলনীতে শিশুদের জিজ্ঞেস করা হয়, “ইসলামে কেন তালাকের অধিকার শুধু স্বামীর হাতে দেওয়া হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করো।” উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে: “কারণ তিনি বেশি ধৈর্যশীল ও সহনশীল।”

অধ্যায়ের শেষে সামাজিক ও দাম্পত্য জীবনে দ্বন্দ্বের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—“কিছু স্ত্রীর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি” এবং “স্বামীর কৃপণতা ও ভরণপোষণে অনীহা”।

ইউএই-তে বাধ্যতামূলক নৈতিক শিক্ষা ক্লাসে শিক্ষার্থীদের দেশটির শাসকগোষ্ঠীর প্রশংসামূলক বিষয়ও শেখানো হয়—যেমন দেশটি “নারীদের ক্ষমতায়ন করে” এবং “শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বে শীর্ষে”। তবে বাস্তবে দেশটিতে মানবাধিকার কঠোরভাবে সীমিত; সমালোচকদের কারাবন্দি করা হয়, সমকামিতা অবৈধ, এবং মুসলিম নারীদের বিয়ের জন্য পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্যের নামকরা বোর্ডিং স্কুলগুলো বিদেশে সম্প্রসারণের মাধ্যমে ধনী প্রবাসীদের কাছ থেকে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু এসব বিষয় তারা গোপন রেখেছে। একটি আইনি ফাঁকফোকরের কারণে বিদেশি ক্যাম্পাস থেকে অর্জিত লাভ তারা “গিফট এইড” হিসেবে করমুক্তভাবে যুক্তরাজ্যে পাঠাতে পারে।

দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত দুই বছরে এইভাবে প্রায় ৭৯ মিলিয়ন পাউন্ড যুক্তরাজ্যে ফেরত এসেছে, যার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের আয় থেকে।

তবে এই বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। চলতি মাসে অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইউএই-র অনেক বেসরকারি স্কুল অনলাইনে ক্লাস শুরু করেছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এক লক্ষের বেশি ব্রিটিশ নাগরিক উপসাগরীয় অঞ্চল ছেড়েছেন, যা শিক্ষার্থী ভর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

হ্যারোর বিশ্বজুড়ে ১৮টি আন্তর্জাতিক স্কুল রয়েছে, তবে এ বছরই প্রথমবারের মতো তারা মধ্যপ্রাচ্যে দুটি ক্যাম্পাস চালু করছে।

উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের সবুজ পরিবেশ থেকে অনেক দূরে, দুবাইয়ে তাদের নতুন ক্যাম্পাসটি হবে একটি মরুভূমির এলাকায়—জেবেল আলি রেসকোর্স এবং আল বারশা পুলিশ স্টেশনের মাঝখানে। একইসঙ্গে উপসাগরের আরও ৭৫ মাইল দূরে, লুভর আবুধাবি জাদুঘরের কাছে আরেকটি বিলাসবহুল দ্বীপে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস তৈরি হচ্ছে।

প্রতিটি স্কুলে প্রায় ২,০০০ শিক্ষার্থী পড়বে। আগস্টে চালু হওয়ার কথা থাকলেও প্রচারণায় মূল ব্রিটিশ স্কুলের ঐতিহাসিক লাল ইটের ভবনগুলোর কথাই বেশি তুলে ধরা হচ্ছে।

“Tradition meets tomorrow”—দুবাইয়ের স্কুলের কাছে একটি বড় বিলবোর্ডে এমনই স্লোগান দেখা যাচ্ছে।

গত এক দশকে ব্রিটিশ বেসরকারি স্কুলগুলোর বিদেশে বিস্তার দ্রুত বেড়েছে। আগে যেখানে ৩৬টি বিদেশি শাখা ছিল, এখন তা বেড়ে ১৬৩-এ দাঁড়িয়েছে, এবং আরও ৪৩টি খোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

চীনে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর মধ্যপ্রাচ্য এখন নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। খুব শিগগিরই এই অঞ্চলে ৪৬টি ব্রিটিশ স্কুলের শাখা চালু হবে, যার মধ্যে ইউএই সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য।

তবে এই সম্প্রসারণ নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। ইউএই সরকারের ‘সাংস্কৃতিক পরিচয়’ জোরদার করার নীতির কারণে সব স্কুলেই সরকার নির্ধারিত নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, এবং এসব পাঠ্যবইয়ের লক্ষ্য বলা হয়েছে শিক্ষার্থীদের “বিচ্যুত চিন্তাধারা থেকে রক্ষা করা”।

দ্য টেলিগ্রাফ ভার্চুয়াল ক্লাসরুম পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে, এসব বই সত্যিই ওই অঞ্চলে পরিচালিত ব্রিটিশ বেসরকারি স্কুলগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে।