ট্রাম্পের দাবি: ইরান যুদ্ধ ‘শেষের পথে’, প্রাইমটাইম ভাষণে সংঘাতের পক্ষে সাফাই

ট্রাম্পের দাবি: ইরান যুদ্ধ ‘শেষের পথে’, প্রাইমটাইম ভাষণে সংঘাতের পক্ষে সাফাই

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ২ এপ্রিল: 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে প্রাইমটাইম ভাষণে দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে এক মাসব্যাপী যুদ্ধ “শেষের দিকে এগোচ্ছে” এবং এটি একটি সফল অভিযান। তবে বাস্তবে এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, ট্রান্স-আটলান্টিক জোটে ফাটল ধরিয়েছে এবং তার নিজস্ব জনপ্রিয়তাও কমিয়েছে।

হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের “ছোট্ট যাত্রা” প্রায় সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে। কিন্তু আগামী “দুই থেকে তিন সপ্তাহে” কীভাবে এই সংঘাত শেষ করবেন—সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা দেননি।

১৯ মিনিটের ভাষণে তিনি বলেন, “আমরা আমেরিকা ও বিশ্বের ওপর ইরানের অশুভ হুমকি শেষ করার দ্বারপ্রান্তে। সব তাস আমাদের হাতে, তাদের হাতে কিছুই নেই।”

অর্থনৈতিক প্রভাবের কথা স্বীকার করে ট্রাম্প বলেন, গ্যাসের দাম বেড়েছে সাময়িকভাবে এবং এর জন্য তিনি ইরানকে দায়ী করেন। একই সঙ্গে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

তবে তার এই বক্তব্য বাজারকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। ভাষণের পরপরই তেলের দাম বেড়ে যায় এবং এশিয়ার শেয়ারবাজারে পতন দেখা যায়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার কারণে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ট্রাম্প অন্য দেশগুলোকে এই গুরুত্বপূর্ণ তেলপথ রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

সংঘাত শুরুর পর থেকেই ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো ৪ ডলার ছাড়িয়েছে।

নিজের সাফল্যের তালিকা তুলে ধরে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের নৌ ও বিমান বাহিনী প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দেশটি এখন আর যুক্তরাষ্ট্র বা বিশ্বের জন্য হুমকি নয়। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর “অত্যন্ত কঠোর” হামলা চালিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, “আমরা তাদের পাথর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাব”—যদিও একই সময়ে আলোচনার কথাও উল্লেখ করেন।

ডেমোক্র্যাট নেতারা ট্রাম্পের ভাষণকে “অসংলগ্ন” বলে সমালোচনা করেন এবং বলেন, এতে সাধারণ আমেরিকানদের মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই। সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার বলেন, এই যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। সিনেটর ক্রিস মারফি বলেন, “এই ভাষণ শুনে কেউ বুঝতে পারেনি আমরা যুদ্ধ বাড়াচ্ছি নাকি কমাচ্ছি।”

অন্যদিকে রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে সাবেক কংগ্রেসওম্যান মার্জরি টেইলর গ্রিন বলেন, এই ভাষণে তিনি শুধু “যুদ্ধের কথাই” শুনেছেন, জীবনযাত্রার খরচ কমানোর কোনো পরিকল্পনা নয়।

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকালে তেহরানে নতুন করে হামলা চালানো হয়। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা তেহরানে দুটি দফায় হামলা চালিয়েছে এবং বৈরুতে হিজবুল্লাহর এক শীর্ষ কমান্ডারকে হত্যা করেছে।

ইরানও পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। তারা ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় অঞ্চলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যা ইহুদি ধর্মীয় উৎসব পাসওভারের আগমুহূর্তে আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

রেড ক্রসের হিসাব অনুযায়ী, ইরানে এখন পর্যন্ত অন্তত ১,৯০০ জন নিহত এবং ২০,০০০ জন আহত হয়েছে। লেবাননে নিহতের সংখ্যা ১,৩০০-এর বেশি। ইসরায়েলে নিহত হয়েছেন ১৯ জন এবং আহত ৫১৫ জন। এছাড়া অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের ভেতরে ১২,৩০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।

যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চাইছে—যা তেহরান “মিথ্যা ও ভিত্তিহীন” বলে উড়িয়ে দিয়েছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এবং প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ক্ষমতায় থাকলেও, ট্রাম্প কাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তা স্পষ্ট নয়।

এর আগে পেজেশকিয়ান সরাসরি মার্কিন জনগণের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন—“এই যুদ্ধ আসলে আমেরিকার জনগণের কোন স্বার্থ রক্ষা করছে?” তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের প্ররোচনায় যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং ইরানের হামলা ছিল “আত্মরক্ষার বৈধ প্রতিক্রিয়া”।

এদিকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, তারা যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অংশ নেয়নি এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতেও উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি তিনি ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার কথাও বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন।

ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, হরমুজ প্রণালী খুলে দিলে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ইরান থেকে সরে আসতে পারে। তবে প্রয়োজন হলে “সুনির্দিষ্ট হামলা” চালানোর সুযোগও খোলা রাখেন।

তিনি এই যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ অতীত যুদ্ধগুলোর তুলনায় আলাদা করে তুলে ধরে বলেন, ৩২ দিনের এই সামরিক অভিযান ছিল “অত্যন্ত শক্তিশালী ও অসাধারণ”।

তবে যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহে গড়ালেও যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য এখনো স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে উদ্বেগকে গুরুত্ব দেননি, যদিও আগে এটিকে যুদ্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। বিশ্লেষকরা তার এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

এদিকে হাজারো মার্কিন সেনা এখনো ওই অঞ্চলে অবস্থান করছে, যা ভবিষ্যতে স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রাখছে।