ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯৮ ।। ইবাদত করে সারা জিন্দেগি: রিয়া করে নষ্ট হচ্ছে বন্দেগি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯৮ ।। ইবাদত করে সারা জিন্দেগি: রিয়া করে নষ্ট হচ্ছে বন্দেগি

উৎসর্গ 
তাঁদের জন্য, যাঁরা ইবাদত করেন, কিন্তু সব সময় গোপন রাখার চেষ্টা করেন

আমাদের দেশের কিছু কিছু মানুষ ‘প’কে ‘ফ’ উচ্চারণ করেন। আবার ‘ফ’কে ‘প’ উচ্চারণ করেন। এ ধরনের আমার এক শক্ত লেখার ভ্ক্ত আছেন। খুবই বন্ধু বৎসল। কোন কিছুতেই সহজে করেন না মাইন্ড। মানুষ হিসাবে তিনি খুবই কাইন্ড। তিনি আমার লেখার যেমন ভক্ত, ঠিক তেমনি আমার কথারও ভক্ত। আমি যা-ই বলি তিনি তা-ই অনায়াসে বিশ্বাস করে ফেলেন। বহুবার তাঁর ঐ উচ্চারণ সংশোধন করার চেষ্টা করেছি। তিনি আমার সামনে বহু কষ্ট করে ঠিকঠাক উচ্চারণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কথা বলতে গিয়ে বেশি আবেগ চলে আসলে বা রেগে গেলে তিনি তার নিজস্ব স্টাইলের উচ্চারণে ফিরে যান।

সেদিন তিনি বেশ উত্তেজিত ছিলেন। হঠাৎ দেখা হতেই বললেন, আজ তাঁর একটা ‘পাংশন’ (অনুষ্ঠান) আছে, ওখানে যেতে হবে একটু পরেই, গল্প করার সময় নেই। বেশ উত্তেজিত কন্ঠেই আবার বললেন, ‘পেইসবুকে’ আজকাল মানুষ কি করছে, কি লিখছে, কি ছবি পোস্ট দিচ্ছে , তা কি আপনি খেয়াল করছেন? তাঁকে জানানো হলো যে, আমি ঠিক আর দশজনের মতো ‘পেইসবুকের’ ভক্ত নই। ওখানে মোটেই সময় নষ্ট করি না। একটা একাউন্ট আছে বটে, তবে লেখা পোস্ট দিয়েই তা আবার বন্ধ করে দেই। তাও কয়েক মিনিটের জন্য ব্যবহার করা হয়। কারণ আমি বিভিন্ন আঙ্গিকের লেখালেখিতে (কলাম, গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি) ব্যস্ত থাকি, সময় হাতে থাকলে। অন্যান্য সময় বইপত্র পড়তে নিবিষ্ট হই, অথবা বাগান করি অথবা বাচ্চাদের সময় দেই। তিনি বেশ উত্তেজিত হয়ে ‘পেইসবুকে’ কিছু মানুষের কিছু ছবি ও লেখার বিষয়ে বারবার তাগিদ দিলেন। তাঁরই তাগিদে আজকের এ লেখা। লেখাটা ধর্ম সংক্রান্ত। আশা করি তাঁকে নিয়ে মজা করার এ পর্বটি তিনি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে নেবেন-এ বিশ্বাস আমার আছে।

মূল কলামে আসা যাক। ইসলাম হলো একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ধর্ম, যা মানুষের আন্তরিকতা, সততা ও আল্লাহর প্রতি খাঁটি ভক্তিকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু আজকের সময় আমরা লক্ষ্য করি, অনেক মুসলিম ইবাদত বন্দেগি যেমন নামাজ, রোজা, যাকাত, এমনকি হজ্বও—করে যাচ্ছেন, কিন্তু সেই ইবাদতের আসল উদ্দেশ্য ভুল পথে ব্যয় করছেন। সমস্যা হলো রিয়া, অর্থাৎ মানুষের চোখে বা প্রশংসার জন্য ইবাদত করা। অবশ্য অনেকের অন্য উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ শেয়ার করেন বেশি ‘লাইক’ পাবার আশায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফেইসবুকের বা সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব অনেক বেড়েছে। আমার কাছে সামাজিক মাধ্যমকে অনেক সময় ‘অসামাজিক মাধ্যম’ বলে মনে হয়। অনেকে আজকাল নিজের নামাজ, রোজা, যাকাত বা হজ্বের ছবি ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করছেন। বারবার লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার পাওয়ার আশায় তারা ইবাদতকে প্রদর্শনীর মাধ্যমে মানুষকে প্রভাবিত করার একটি মাধ্যম বানিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু এখানেই প্রধান ভুল হচ্ছে, যে মহান স্রষ্টা আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি আমাদের লাইক দিচ্ছেন, সেদিকে একটুও খেয়াল রাখছেন না।

আবার অনেকে বিবি, বাচ্চা, বৃদ্ধ বাবা-মা, ভাইবোন, তরুন মেয়ে এদেরকে নিয়ে কখন কি করছেন, কোথায় বেড়াতে যাচ্ছেন, কার বাড়িতে যাচ্ছেন, কি দিয়ে খাচ্ছেন, কোথায় বসছেন, কোথায় ঘুমাচ্ছেন ইত্যাদি ঘন্টায় ঘন্টায় এত বিশদভাবে পোস্ট করছেন যা দেখতেই লজ্জা লাগে। আবার পোষাকেও অনেকের শালিনতার বাঁধ থাকে না। আসলে এসব কর্ম তো একান্ত ব্যক্তিগত। এটা কি সামাজিক মাধ্যমে সব মানুষের সামনে প্রচার করার কোন বিষয়? তাহলে ‘প্রাইভেসী’ বলে কি আর কিছু বাকি থাকলো জীবনে? আজকাল নাকি অনেক চোরও ফেইসবুকে আগে দেখে নেয়, ঐ বাসার মালিক এখন কোথায় আছেন, তারপর ঐ ঘরে চুরি করতে যায়!

অনেকে আবার মৃত বাবা-মার ছবিও পোস্ট করেন। আমি আমাদের তরুণবেলায় দেখেছি, যে বাবা-মা ছেলের বন্ধু বান্ধবদের সাথেও দেখা করতে কুন্ঠাবোধ করতেন বা লজ্জাবোধ করতেন, সেই মৃত বাবা-মাকে সন্তানরা ফেইসবুকে পোস্ট করে কি বোঝাতে চান, সেটা বুঝে আসে না। এরা তো অত্যন্ত পরেজগার মানুষ ছিলেন। এখন দুনিয়াতে নেই। তাঁদের পর্যন্ত জনসম্মুখে প্রদর্শন করে ‘লাইক’ পাবার লোভ কি শিক্ষিত, রুচিশীল সন্তানরা সংবরণ করতে পারেন না? এতে কি তাঁদের আত্মা শান্তি পাবে?

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন:

যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নয়, মানুষের প্রশংসার জন্য দান করে, তার লাভ কিছুই নেই।
সূরা আল-ইমরান, :৯১

এছাড়া হাদিসে আছে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন:

যদি তোমাদের আমল মানুষের জন্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে হয়, তবে তোমাদের কোনো পুরস্কার নেই।

সামাজিক মাধ্যমের এই নতুন যুগে রিয়া আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। অনেকে দেখি, নামাজ বা রোজা করে, ইফতার সামনে নিয়ে ফেইসবুকে ছবি পোস্ট করে সবাইকে দেখান। কিন্তু এটা একবারও ভেবে দেখেন না, যার ইফতার করার মতো তেমন কিছুই জুটে না কপালে, তাদের কেমন লাগে ঐ পোস্ট দেখলে, বা এত খাদ্য দিয়ে অপরকে ইফতার করতে দেখলে?

আবার অনেকে বিশাল প্রচার প্রচারণা করে, লাইন ধরিয়ে, দুইশত টাকা দামের শাড়ি দেন যাকাত হিসাবে। কিন্তু কতজন দরিদ্র মানুষ যে ঐ যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পায়ের তলায় পিষ্ট হচ্ছে সেদিকে ভ্রক্ষিপ করেন না। এসব ছবি আবার ফেইসবুকে গর্বের সাথে প্রচার করেন।

বেশ ক‘বছর ধরে দেখছি, অনেকে হজ্ব পালন করার সময়, হ্জ্ব থেকে ফিরে, হজ্বের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা করার সময় বিভিন্ন এঙ্গেলে ছবি শেয়ার করেন ফেইসবুকে। কিন্তু এসব এবাদত তো একমাত্র আল্লাহর কাছে লাইক পাবার জন্য, আম জনতার লাইক পাবার জন্য নয়। এটা তো ‘রিয়া’ বা লোক দেখানো এবাদত হয়ে যায়। অন্তরের সত্যিকারের খোঁজ বা তো মহান আল্লাহ রাখেন।

ইবাদত হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি পবিত্র মাধ্যম, আত্মার শুদ্ধির পথ। যদি আমরা এই উদ্দেশ্য ভুলে যাই, তাহলে তা শুধু রূপকল্পে মানুষের চোখে সুন্দর দেখানোর এক খেলা হয়ে যায়। বাস্তবে সেই ইবাদত অলাভজনক এবং নিঃশেষ

আমাদের উচিত প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রশ্ন করা:

  • আমি কি সত্যিই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়ছি, নাকি শুধু অন্যকে দেখানোর জন্য?
  • আমার দান কি আল্লাহর জন্য, নাকি সামাজিক প্রশংসার জন্য?
  • হজ্ব বা রোজার উদ্দেশ্য কি আত্মশুদ্ধি, নাকি “ফটো-শেয়ার ও লাইক” অর্জন?

যদি আমরা সতর্ক হই এবং এই অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করি, তবে রিয়া দূর হবে, এবং আমাদের বন্দেগি সত্যিকারের অর্থে পূর্ণতা পাবে। ইসলাম শিখায়, ইবাদত শুধুই আল্লাহর জন্য, মানুষের জন্য নয়। রিয়া হলো বন্দেগির সবচেয়ে বড় শত্রু। আমাদের প্রতিটি ইবাদত যেন অন্তরের খাঁটি, নিঃস্বার্থ ভক্তির প্রতিফলন হয়, সামাজিক মাধ্যমের চমক নয়।

রিয়া করলে শেষ বিচারের দিন এমন এক দৃশ্য উপস্থিত হবে, যা আমাদের জন্য গভীর চিন্তার বিষয়। অনেক মানুষ আসবে, যারা দুনিয়াতে নামাজ, রোজা, হজ্ব, দান-খয়রাত—সবই করেছে। বাহ্যিকভাবে তাদের আমলের কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু যখন তাদের সামনে জান্নাতের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে, তখন তারা বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করবে—

হে আল্লাহ! আমরা তো এত ইবাদত করেছি, তাহলে কেন আমরা বঞ্চিত হলাম?”

এই প্রশ্নের উত্তর কোরআন ও হাদিসে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

আর আমি তাদের সব আমলের দিকে অগ্রসর হব, অতঃপর সেগুলোকে ছাই-বিক্ষিপ্ত ধূলিকণার মতো করে দেব।
সূরা আল-ফুরকান, ২৫:২৩

অর্থাৎ, যে আমল বাহ্যিকভাবে বড় মনে হয়, কিন্তু নিয়ত বিশুদ্ধ নয়, তা আল্লাহর কাছে কোনো মূল্যই পাবে না।

আরও ভয়ংকর সতর্কবার্তা এসেছে সহিহ হাদিসে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন প্রথম যাদের বিচার হবে, তাদের মধ্যে থাকবে—
একজন আলেম, একজন শহীদ এবং একজন দানশীল ব্যক্তি। তারা সবাই দাবি করবে, তারা আল্লাহর জন্য কাজ করেছে। কিন্তু আল্লাহ তাদের বলবেন:

তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি এসব করেছো যাতে মানুষ তোমাকে আলেম, বীর বা দানশীল বলেএবং দুনিয়াতে তা বলা হয়েছে।
সহিহ মুসলিম

এরপর তাদেরকে কঠিন শাস্তির দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।

এই হাদিস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—
ইবাদত যত বড়ই হোক, যদি তা রিয়া বা লোক দেখানোর জন্য হয়, তাহলে তা ধ্বংস হয়ে যাবে।

সুতরাং, শেষ বিচারের দিনে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে জবাব আসবে, তা হবে অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট:

তুমি যে উদ্দেশ্যে ইবাদত করেছিলে, তার প্রতিদান তুমি দুনিয়াতেই পেয়ে গেছোমানুষের প্রশংসা, লাইক, সম্মান। এখন আমার কাছে তোমার জন্য কিছুই নেই।

যারা শেষ বিচারের এই দৃশ্য সত্যিকার অর্থে বিশ্বাস করেন এ লেখা শুধু তাঁদেরই জন্য। কারণ, জীবনভর ইবাদত করেও যদি রিয়ার কারণে তা নষ্ট হয়ে যায়, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। কারণ তখন তো পৃথিবীতে আবার ফিরে এসে সহিভাবে ইবাদত করে পূণ্য অর্জনের আর সুযোগ থাকবে না। কিন্তু যদি সামান্য ইবাদতও খাঁটি নিয়তে করা যায়, সেটিই হবে আমাদের মুক্তির পথ।

 এ ধরনের মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য তাহলে করণীয় কি ?

প্রথমত, ইবাদতের নিয়ত শুদ্ধ করা সবচেয়ে জরুরি। প্রতিটি নামাজ, রোজা বা দান করার আগে নিজের অন্তরে জিজ্ঞেস করতে হবে—আমি কি এটি শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছি?

দ্বিতীয়ত, গোপনে ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা। যে ইবাদত মানুষ জানে না, সেটিই আল্লাহর কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। বিশেষ করে দান-সদকা এমনভাবে করা উচিত, যাতে ডান হাত যা দেয়, বাম হাতও তা না জানে।

তৃতীয়ত, সামাজিক মাধ্যমে সংযম বজায় রাখা। ইবাদতকে কখনোই প্রদর্শনের বস্তু বানানো উচিত নয়। প্রয়োজন ছাড়া ইবাদতের ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

চতুর্থত, নিজেকে নিয়মিত আত্মসমালোচনার মধ্যে রাখা। প্রতিদিন নিজের কাজগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে কোথাও রিয়া ঢুকে পড়ছে কি না।

পঞ্চমত, সৃজনশীল কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা। পরিবারকে সঠিকভাবে কোয়ালিটি টাইম দেওয়া। পাড়া প্রতিবেশির সাথে সন্ধাব বজায় রাখতে তাঁদের সাথে কিছু সময় কাটানো। নিজের ও পরিবারের শাররিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য নানা কার্যক্রমে অংশ নেয়া।

সবশেষে, আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া করা—তিনি যেন আমাদের সকল ইবাদতকে রিয়া থেকে মুক্ত রাখেন এবং খাঁটি নিয়তে কবুল করেন।

 

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক

লেন্ডন, ৮ এপ্রিল, ২০২৬