ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৪৬ ।। দেশে নেই পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, নেই গ্যাস : জনগণের জীবন শেষ

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৪৬ ।। দেশে নেই পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, নেই গ্যাস : জনগণের জীবন শেষ

উৎসর্গ

সেই সাধারণ মানুষের জন্য, যারা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটকে শুধু খবর হিসেবে নয়, প্রতিদিনের বাস্তব যন্ত্রণা হিসেবে অনুভব করছেন।

একটি দেশের মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় দুর্ভোগ আর কী হতে পারে—যখন ঘরে আলো নেই, চুলায় আগুন নেই। তীব্র গরমে মানুষ যখন একটু স্বস্তির জন্য বিদ্যুতের অপেক্ষায় থাকে, তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে লোডশেডিং। রান্নার সময় চুলার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, কখন গ্যাসের চাপ আসবে। আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে মানুষ যেন ফিরে যাচ্ছে পুরোনো অন্ধকার সময়ে।

দেশে এখন একসঙ্গে চলছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট। একটি সংকট আরেকটি সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। গ্যাসের অভাবে কমছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, আর বিদ্যুৎ না থাকায় থেমে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা। ঘরে অশান্তি, কর্মক্ষেত্রে স্থবিরতা, ব্যবসায় ক্ষতি—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যার খেসারত কেন দিতে হবে সাধারণ মানুষকে?

অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে জনজীবন

তীব্র গরমের মধ্যে দেশজুড়ে লোডশেডিং এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শুধু সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে নয়, মধ্যরাতের পরও দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ থাকছে না।

বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। আবার কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ মিলছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে অনেক এলাকায় দিনে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় দিনে ২০ থেকে ২৫ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যশোরের অভয়নগর, রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ, ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র।

মানুষ বাধ্য হয়ে মোমবাতি, চার্জলাইট ও বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু গরমের রাতে এসব কোনো সমাধান নয়।

বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে গ্যাসের অভাব

বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি। গ্যাস না থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬২টি জ্বালানি সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তরল জ্বালানিভিত্তিক এবং দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ ১৭ শতাংশের বেশি কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগে দৈনিক ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে তা কমে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট থেকে কমে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে।

ঘাটতি হাজার হাজার মেগাওয়াট

বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে। গত সপ্তাহে দৈনিক গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৪৮২ মেগাওয়াট। এর আগের সপ্তাহে এই ঘাটতি ছিল মাত্র ৩২০ মেগাওয়াট।

১ আগস্ট বিদ্যুৎ ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াটে। পরদিন ভোরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়—ঘাটতি পৌঁছে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটে।

এক পর্যায়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ২০১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৬৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি থেকেই যায়।

এই ঘাটতির চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। বিতরণ কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করছে।

শিল্প ও ব্যবসায় বড় ধাক্কা

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে শিল্প খাতে। নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুরসহ শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

কারখানাগুলোকে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে, পরিবর্তন করতে হচ্ছে উৎপাদন সূচি। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য এই সংকট আরও ভয়াবহ। বিদ্যুৎ চলে গেলে শুধু মেশিন বন্ধ হয় না, নষ্ট হয় উৎপাদনের সময়, বাড়ে খরচ, কমে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবস্থাও ভালো নয়। দোকান, রেস্তোরাঁ, ওয়ার্কশপ, কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবসা—সবখানেই বিদ্যুতের অভাবে ক্ষতি হচ্ছে।

ময়মনসিংহের ফুলপুরের এক চালকল মালিকের অভিজ্ঞতা যেন পুরো দেশের ব্যবসায়ীদের বাস্তবতা তুলে ধরে। তিনি জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় কর্মচারীরা দিনের পর দিন বসে থাকছেন, উৎপাদন বন্ধ থাকছে।

কৃষি ও জীবিকাতেও সংকট

বিদ্যুৎ সংকট শুধু শহর বা শিল্প এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও।

সেচনির্ভর কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিদ্যুতের অভাবে। কুমিল্লার মাছচাষিরা বলছেন, পাম্প চালাতে না পারায় কাজ শেষ করতে কয়েক দিনের বদলে কয়েক রাত লেগে যাচ্ছে। এতে বাড়ছে খরচ, কমছে লাভ।

অটোরিকশা ও ইজিবাইক চালকরাও বিপাকে পড়েছেন। ব্যাটারি চার্জ দিতে না পারায় অনেকেই নিয়মিত গাড়ি চালাতে পারছেন না। ফলে আয় কমছে, কিন্তু সংসারের খরচ একই থাকছে।

হাসপাতাল ও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ

বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রভাব পড়ছে হাসপাতাল ও শিক্ষাক্ষেত্রে।

বিদ্যুৎ না থাকলে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে রোগীদের কষ্ট বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও শ্বাসকষ্টের রোগীরা বেশি সমস্যায় পড়েন।

অন্যদিকে পরীক্ষার সময়ে লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাতের অন্ধকারে অনেক শিক্ষার্থী মোমবাতি বা চার্জলাইটের আলোয় পড়াশোনা করছে।

একজন শিক্ষার্থীর জন্য কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুধু অন্ধকার নয়, তার ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্যয়বহুল বিদ্যুতের বোঝা

বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে এখন ব্যয়বহুল উৎসের দিকে যেতে হচ্ছে। ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হচ্ছে, যদিও এসব কেন্দ্রের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি।

ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সাধারণত জরুরি পরিস্থিতিতে চালানো হয়। কিন্তু বর্তমান সংকটে সেগুলোও চালাতে হচ্ছে।

একই সঙ্গে কয়লা সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যার কারণে কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

মানুষের প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?

বিদ্যুৎ ও গ্যাস মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। এটি কোনো বিলাসিতা নয়। আলো, রান্না, শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত।

একটি দেশের মানুষ যদি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জন্য প্রতিদিন সংগ্রাম করে, তাহলে উন্নয়নের গল্প কতটা বাস্তব—সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

মানুষ জানতে চায়, এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কোথায়? কেন বারবার জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে? কেন সাধারণ মানুষকে অন্ধকার ও দুর্ভোগের মূল্য দিতে হচ্ছে?

দেশের মানুষ শুধু বিদ্যুৎ চায় না, তারা চায় নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা। তারা শুধু গ্যাসের সংযোগ চায় না, তারা চায় স্বাভাবিক জীবন।

কারণ দেশে যখন নেই বিদ্যুৎ, নেই গ্যাস—তখন শুধু ঘর অন্ধকার হয় না, অন্ধকার হয়ে যায় মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের পথ।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ৪ আগস্ট, ২০২৬