ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯৭ ।। দেশে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়েছে হাম, স্বাস্থ্য কর্মীদের ছুটছে ঘাম
উৎসর্গ
সেই সকল শিশুদের, যারা টিকার অভাবে মারা গেছে, এবং তাদের মা-বাবাদের অসহায় ধৈর্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।”

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে হঠাৎ করেই এক অদৃশ্য আতঙ্ক ফিরে এসেছে—হাম। যে রোগকে আমরা প্রায় নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে ধরে নিয়েছিলাম, সেটিই এখন নতুন করে শিশুদের জীবনে মৃত্যুফাঁদ হয়ে দেখা দিচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহের পরিসংখ্যান শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং এক ধরনের সতর্কবার্তা—আমরা কোথাও না কোথাও বড় ধরনের শৈথিল্যের শিকার হয়েছি।

১৫ মার্চ থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত মাত্র কয়েক সপ্তাহে প্রায় ছয় হাজার শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক শিশুর মৃত্যু—সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি শতাধিক পরিবারের চিরস্থায়ী শোকের নাম। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তদের বড় অংশই এমন বয়সের শিশু, যারা এখনও টিকার পূর্ণ সুরক্ষা পায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের ৫৬ জেলায় ইতোমধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজার, বরগুনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর—এই জেলাগুলো এখন উচ্চঝুঁকির তালিকায়। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসহ কয়েকটি নগর এলাকাও ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ, সংক্রমণ এখন গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই বিস্তৃত।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর। রাজধানী থেকে জেলা হাসপাতাল—সবখানেই শয্যা সংকট, আইসিইউ সংকট, এমনকি এক বেডে একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দেওয়ার মতো কঠিন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। রাজশাহী ও বরিশালের হাসপাতালগুলোতে শিশুদের বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। এটি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার নগ্ন প্রকাশ।
এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিলের সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝায়, অন্যদিকে তেমনি একটি জরুরি বাস্তবতাও তুলে ধরে—আমাদের জনবল পর্যাপ্ত নয়। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারীরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন, কিন্তু একটি মহামারিসদৃশ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যে প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা স্পষ্টতই অপর্যাপ্ত।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—হঠাৎ করে কেন এই প্রাদুর্ভাব?
প্রথমত, টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি। কোভিড-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদানে যে বিঘ্ন ঘটেছিল, তার প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ের টিকা পায়নি। দ্বিতীয়ত, জনসচেতনতার অভাব। অনেক অভিভাবক এখনও টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে উদাসীন, কেউ কেউ আবার ভুল তথ্যের কারণে টিকা এড়িয়ে চলছেন। তৃতীয়ত, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বল সমন্বয়—স্থানীয় পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপের অভাব।
সরকার ইতোমধ্যে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটির কিছু ওয়ার্ডে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম চালু হচ্ছে। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন হলো—এটি কি যথেষ্ট, নাকি এটি শুধু আগুন লাগার পর পানি ঢালার মতো একটি দেরিতে নেওয়া উদ্যোগ?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকা দিলেই হবে না; দরকার সমন্বিত উদ্যোগ। আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত রোগ শনাক্ত, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ, এবং কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে জনবল বৃদ্ধি ও দক্ষতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করতে হবে।
এই সংকট আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরেছে—স্বাস্থ্য খাতকে অবহেলা করার সুযোগ আর নেই। উন্নয়ন, অবকাঠামো, বড় বড় প্রকল্প—সবকিছুই অর্থহীন হয়ে পড়ে, যদি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ আমাদের শিশুদের জীবন কেড়ে নেয়।
হাম কোনো নতুন রোগ নয়, এর প্রতিকারও আমাদের জানা। তবু যদি শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়, তবে দায় শুধু ভাইরাসের নয়—দায় আমাদের প্রস্তুতির, আমাদের অবহেলার, আমাদের নীতিনির্ধারণের।
এখন সময় দ্রুত, সমন্বিত এবং বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার। কারণ প্রতিটি হারানো শিশুর জীবন আমাদের ব্যর্থতার সাক্ষ্য হয়ে থাকবে—যদি আমরা এখনই না জাগি।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৬ এপ্রিল ২০২৬