ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯৯ ।। নিষিদ্ধ রাজনীতি, বৈধ সংকট — গণতন্ত্রের নতুন দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ
উৎসর্গ
“গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আদর্শকে”

বাংলাদেশের সংসদ অধিবেশন চলাকালীন সময়ে
এই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসেছে। বিশেষ করে, যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলো। এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে না; বরং এটি রাষ্ট্র, আইন এবং গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণাকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বাংলাদেশে জনতার সংগ্রাম চলছেই
প্রথমত, এই সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি বিশ্লেষণ করা জরুরি। ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনের মাধ্যমে সরকার যে ক্ষমতা পেয়েছে—কোনো “সত্তা” বা সংগঠনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নিষিদ্ধ করার—তা আন্তর্জাতিকভাবে অস্বাভাবিক নয়। অনেক গণতান্ত্রিক দেশেও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে এমন আইন রয়েছে। কিন্তু পার্থক্য তৈরি হয় প্রয়োগে। যখন একটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে এই আইনের আওতায় আনা হয়, তখন সেটি আইন প্রয়োগের প্রশ্ন ছাড়িয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, প্রতিশোধ কিংবা ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নে পরিণত হয়।
এখানে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ হয়েছে—সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এই আইন কার্যকর হলে শুধু দলীয় কার্যক্রম নয়, বরং দলটির নেতাকর্মীদেরও শাস্তির আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে। অর্থাৎ এটি আর শুধুমাত্র রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং একটি বিস্তৃত আইনি কাঠামো, যা ভবিষ্যতে বিচারিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক কার্যক্রমকে একসাথে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এখানে একটি বড় ফ্যাক্টর। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার সংস্কৃতি বাংলাদেশে যে ক্ষত তৈরি করেছিল, তা আজও পুরোপুরি মুছে যায়নি। সেই প্রেক্ষাপটে বিএনপি নিজেই একসময় এই ধরনের পদক্ষেপের সমালোচক ছিল। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দলটি বলেছিল—নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত জনগণের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। এখন তারাই একই ধরনের একটি সিদ্ধান্ত কার্যকর করায় একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে এসেছে—বাংলাদেশ কি রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি ‘চক্রাকার প্রতিশোধনীতি’-তে আটকে পড়ছে?
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও কৌশলগত হিসাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাঠে ফিরে এলে ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি হয়তো একটি ‘ঝুঁকিমুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ’ বজায় রাখতে চাইছে। আবার অন্যদিকে, জামায়াতসহ অন্যান্য জোটের চাপও একটি বাস্তবতা, যা সরকারকে এই সিদ্ধান্তে প্রভাবিত করতে পারে।

বাংলাদেশে রাজপথে সহিংসতার ভয়াবহতা
তবে নতুন তথ্য বলছে, এই নিষেধাজ্ঞা না থাকলে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যেত এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতো। অর্থাৎ সংসদে এটি পাস করার মাধ্যমে সেই সম্ভাবনাটি ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করা হয়েছে—যা রাজনৈতিক কৌশলের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—গণতন্ত্রের মানদণ্ড। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি আইনি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সমাধান করা যায়? নাকি এর সমাধান হওয়া উচিত নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও জনগণের রায়ে? একজন ব্যক্তি অপরাধ করলে তার বিচার হতে পারে, কিন্তু একটি পুরো দলকে নিষিদ্ধ করা হলে সেটি লক্ষ লক্ষ সমর্থকের রাজনৈতিক অধিকারকেও সীমাবদ্ধ করে।
এখানেই আসে “পাবলিক সেন্টিমেন্ট” বা জনমতের প্রশ্ন। সরকার বলছে, জনগণের তীব্র ক্ষোভের প্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু জনমত সবসময় কি ন্যায়বিচারের সমান? ইতিহাস বলে, অনেক সময় জনমত আবেগপ্রবণ হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত তৈরি করতে পারে।
এছাড়া, নতুন সংশোধনের ফলে নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের কার্যক্রমে যুক্ত থাকলেই শাস্তির আওতায় পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে শুধু রাজনীতিকরাই নয়, সাধারণ সমর্থক কিংবা সহানুভূতিশীল নাগরিকদেরও আইনি ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে—যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
আইনজীবী ও বিশ্লেষকদের একটি অংশ সতর্ক করে দিয়েছেন—এই নজির ভবিষ্যতে আরও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পথ খুলে দিতে পারে। অর্থাৎ আজ যে আইন একটি দলের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে, কাল সেটি অন্য কারও বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি ‘স্লিপারি স্লোপ’।
অন্যদিকে, যারা এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন, তারা যুক্তি দিচ্ছেন—যদি কোনো দল গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি বা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তাদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার নৈতিক অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এই যুক্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এর সমাধান হওয়া উচিত স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়।
রাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব কি হতে পারে-
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।
প্রথমত, একটি কার্যকর বিরোধী শক্তির অনুপস্থিতি রাজনৈতিক ভারসাম্যকে দুর্বল করে দিতে পারে। এতে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে জবাবদিহিতার চাপ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
দ্বিতীয়ত, নিষিদ্ধ রাজনীতি প্রায়শই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স’-এর জন্ম দেয়। প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে না পারলে কোনো দলের সমর্থকরা গোপন বা বিকল্প পথে সক্রিয় হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তৃতীয়ত, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করতে পারে। ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে প্রতিপক্ষকে নিষিদ্ধ করার প্রবণতা বাড়লে, বাংলাদেশের রাজনীতি একটি স্থায়ী অনিশ্চয়তা ও প্রতিশোধের চক্রে আটকে পড়তে পারে।
চতুর্থত, ভোটারদের একটি বড় অংশ যদি মনে করে তাদের রাজনৈতিক পছন্দকে আইনি উপায়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তাহলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা বাড়তে পারে। এতে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সবশেষে বলা যায়, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে একটি জটিল দ্বিধায় ফেলেছে—নিরাপত্তা বনাম গণতন্ত্র, প্রতিশোধ বনাম ন্যায়বিচার, এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা বনাম নৈতিক অবস্থান।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে একটি এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে নির্বাচনের মাধ্যমে, প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়; এবং আইন হবে ন্যায়বিচারের হাতিয়ার, রাজনৈতিক অস্ত্র নয়।
এই মুহূর্তে প্রশ্নটি শুধু আওয়ামী লীগ বা বিএনপির নয়—প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশ কোন্ ধরনের গণতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে?
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১০ এপ্রিল