ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১০০ ।। মুজিবনগর সরকার: যুদ্ধের মাঝে রাষ্ট্রগঠনের বিস্ময়কর অধ্যায়
উৎসর্গ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুজিবনগর সরকারের অজানা রূপকারদের প্রতি

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যা শুধু স্মৃতির নয়—রাষ্ট্রচিন্তা, কৌশল এবং নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তেমনই একটি দিন, যেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার—মুজিবনগর সরকার। যুদ্ধের উত্তাল প্রেক্ষাপটে এমন একটি সংগঠিত রাষ্ট্র কাঠামো দাঁড় করানো ছিল শুধু সাহসিকতার নয়, বরং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয়।

২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর গণহত্যা এবং ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পর পূর্ববাংলা কার্যত একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। কিন্তু সেই ভয়াবহতার মধ্যেও একটি প্রশ্ন সামনে আসে—স্বাধীনতার দাবি কি শুধু আবেগে টিকে থাকবে, নাকি তা একটি কার্যকর রাষ্ট্র কাঠামোয় রূপ নেবে? এই প্রশ্নের উত্তরই ছিল মুজিবনগর সরকার।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন, খোন্দকার মুশতাক, এম মনসুর আলী,এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামান, কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানী
এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ—যিনি রাজনৈতিক সংকটের ভেতরেও সংগঠনের পথ খুঁজে নিয়েছিলেন। আত্মগোপন থেকে শুরু করে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের সহায়তা আদায়—সবকিছুই তিনি করেছিলেন সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে। তাঁর উপলব্ধি ছিল স্পষ্ট: একটি স্বীকৃত সরকার ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবে না।
ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ ছিল এই রাষ্ট্রগঠনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী-র সঙ্গে বৈঠকে তাজউদ্দীন নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেন। এই কৌশল শুধু রাজনৈতিক নয়, কূটনৈতিকভাবেও অত্যন্ত কার্যকর ছিল। এর ফলেই ভারত সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সহায়তা এবং শরণার্থীদের আশ্রয়ের বিষয়ে সম্মত হয়।

১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় শেখ মুজিবুর রহমান-কে, যদিও তিনি তখন পাকিস্তানে বন্দি। তাঁর অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দীন আহমদ। মন্ত্রিসভায় আরও ছিলেন এম মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান।
১৯৭১ সালের মুজিবনগর সরকারের (প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার) মন্ত্রী পরিষদের প্রধান ব্যক্তিবর্গ ও তাদের দায়িত্ব ছিল নিম্নরূপ—
রাষ্ট্রপতি: শেখ মুজিবুর রহমান (অনুপস্থিতিতে নির্বাচিত নেতা)
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি: সৈয়দ নজরুল ইসলাম
প্রধানমন্ত্রী: তাজউদ্দীন আহমদ
অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়: তাজউদ্দীন আহমদ (প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন)
পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়: খন্দকার মোশতাক আহমদ
স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়: এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামান
মন্ত্রিপরিষদ সদস্য (Cabinet Minister): এম মনসুর আলী
চিফ হুইপ (Chief Whip): মোহাম্মদ তোফায়েল আহমেদ
সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সমন্বয় (আংশিক দায়িত্ব): কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানী (সেনাপ্রধান / কমান্ডার ইন চিফ, মুক্তিবাহিনী)
এই সরকারের একটি বড় সাফল্য ছিল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা। মাত্র চারজন মন্ত্রী ১২টিরও বেশি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাগ করে নেন। প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, স্বাস্থ্য, তথ্য—সব ক্ষেত্রেই একটি কার্যকর প্রশাসন গড়ে ওঠে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যুদ্ধ পরিচালনার জন্য দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে এবং প্রতিটি সেক্টরে কমান্ডার নিয়োগ দেয়। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ একটি সংগঠিত সামরিক কাঠামো পায়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক মিশন স্থাপন করে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়। কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা কাজ করেন। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা হয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও মুজিবনগর সরকার ছিল সংগঠিত। একটি বাজেট প্রণয়ন, ট্রেজারি গঠন এবং “বাংলাদেশ ফান্ড” প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনার অর্থনৈতিক ভিত্তি নিশ্চিত করা হয়। প্রবাসী বাঙালি ও বিদেশি সহায়তা এই তহবিলে জমা হতো, যা মুক্তিযুদ্ধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তথ্য ও প্রচারযুদ্ধে “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র” ছিল সরকারের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। এই বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের ভেতরে ও বাইরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি এবং মনোবল ধরে রাখার কাজ চলতে থাকে।
১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণের মাধ্যমে মুজিবনগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এই স্থানটির নামকরণ করা হয় “মুজিবনগর”—যা আজও বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
মুজিবনগর সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল—একটি যুদ্ধরত জাতিকে সংগঠিত করা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে এগিয়ে নেওয়া এবং স্বাধীনতার লড়াইকে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসা। এটি ছিল একদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিজয়, অন্যদিকে একটি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা।
আজকের প্রজন্মের কাছে মুজিবনগর সরকার শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি একটি শিক্ষা—সংকট যত গভীরই হোক, সঠিক নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও ঐক্য থাকলে একটি জাতি নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে নিতে পারে।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১০ এপ্রিল ২০২৬