তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
হলবর্ন-সেন্ট প্যানক্রাসে ৩,৩৬৪ ভোটে জয়ী লেবারের সাগাল, গ্যালোওয়ের মাত্র ৩১৪
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৯ অক্টোবর :
সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে শৈশবে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেওয়া সাগাল আবদি-ওয়ালি লন্ডনের হলবর্ন ও সেন্ট প্যানক্রাস আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। লেবার পার্টির এই প্রার্থী গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কিকে ৩ হাজার ৩৬৪ ভোটে হারিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ছেড়ে দেওয়া আসনটি ধরে রেখেছেন। নির্বাচনে সাগাল পেয়েছেন ১২ হাজার ২৯২ ভোট, আর পোলানস্কি পেয়েছেন ৮ হাজার ৯২৮ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন মোট ১৫ জন প্রার্থী।
সাগালের এই জয় শুধু একটি উপনির্বাচনের ফল নয়; শরণার্থী হিসেবে ব্রিটেনে আসা একজন নারীর স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় সংসদে পৌঁছানোর দীর্ঘ পথচলারও নতুন অধ্যায়।

১৫ প্রার্থীর নির্বাচনী লড়াই, কে কত ভোট পেলেন
৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনের ভোট গণনা শেষে ৯ অক্টোবর ফল ঘোষণা করা হয়। ক্যামডেন কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৩৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
পূর্ণাঙ্গ ফলাফল:
১. সাগাল আবদি-ওয়ালি — লেবার পার্টি: ১২,২৯২ ভোট (৪৫.১৭ শতাংশ)
২. জ্যাক পোলানস্কি — গ্রিন পার্টি: ৮,৯২৮ ভোট (৩২.৮১ শতাংশ)
৩. ইওয়ান ক্যামেরন — কনজারভেটিভ পার্টি: ১,৯২২ ভোট (৭.০৬ শতাংশ)
৪. পিটার নিউম্যান — রিফর্ম ইউকে: ১,৬১২ ভোট (৫.৯২ শতাংশ)
৫. প্যাট্রিক স্টিলম্যান — লিবারেল ডেমোক্র্যাটস: ৯২৪ ভোট (৩.৪০ শতাংশ)
৬. টাইলার জনসন — রিস্টোর ব্রিটেন: ৬৯২ ভোট (২.৫৪ শতাংশ)
৭. জর্জ গ্যালোওয়ে — ওয়ার্কার্স পার্টি অব ব্রিটেন: ৩১৪ ভোট (১.১৫ শতাংশ)
৮. ব্রায়নি কাপুর — রিজয়েন ইইউ: ২৩৬ ভোট (০.৮৭ শতাংশ)
৯. বার্মি ব্রাঞ্চ — অফিসিয়াল মনস্টার রেভিং লুনি পার্টি: ৮৭ ভোট (০.৩২ শতাংশ)
১০. হেলেন স্পাইবি-ভ্যান — ক্রিশ্চিয়ান পিপলস অ্যালায়েন্স: ৬৩ ভোট (০.২৩ শতাংশ)
১১. ক্লেয়ার ফিশার — ক্লাইমেট পার্টি: ৫১ ভোট (০.১৯ শতাংশ)
১২. বেন ওয়াকার — ইউকেআইপি: ৫১ ভোট (০.১৯ শতাংশ)
১৩. কেতনকুমার পিপালিয়া — ইউকে ভয়েস: ২৩ ভোট (০.০৮ শতাংশ)
১৪. জোনাথন সিলবারম্যান — কমিউনিস্ট লীগ: ৯ ভোট (০.০৩ শতাংশ)
১৫. টম ডারউড — স্বতন্ত্র প্রার্থী: ৭ ভোট (০.০৩ শতাংশ)
প্রার্থীদের ভোট ও দলীয় পরিচয়ের সূত্র: স্কাই নিউজের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ ফলাফল এবং ক্যামডেন কাউন্সিলের প্রার্থী তালিকা।
জর্জ গ্যালোওয়ের কী হলো?
ব্রিটিশ রাজনীতির অভিজ্ঞ নেতা জর্জ গ্যালোওয়ে এই নির্বাচনে পেয়েছেন মাত্র ৩১৪ ভোট, যা মোট ভোটের ১.১৫ শতাংশ। ওয়ার্কার্স পার্টি অব ব্রিটেনের এই নেতা নির্বাচনী প্রচারের সময় যুক্তরাজ্যের বাইরে ছিলেন। তিনি নিজেই তাঁর অবস্থানকে ‘স্বেচ্ছানির্বাসন’ বলে বর্ণনা করেছেন। ২০২৫ সালে গ্যাটউইক বিমানবন্দরে সন্ত্রাসবাদবিরোধী পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের পর থেকে তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
গ্যালোওয়ে এর আগে সাতবার ব্রিটিশ সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু স্টারমারের সাবেক আসনে আবারও সংসদ সদস্য হওয়ার চেষ্টা সফল হয়নি। তাঁর ৩১৪ ভোট সাগালের ১২ হাজার ২৯২ ভোটের তুলনায় অনেক কম।

সোমালিয়া থেকে ব্রিটেন: শৈশবের শরণার্থীজীবন
সাগাল আবদি-ওয়ালির জন্ম সোমালিয়ায়। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ায় দেশটির গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে তিনি পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে আসেন। তাঁর বয়স তখন প্রায় ছয় বছর। পরিবারটি ১৯৯১ সালে যুদ্ধের কারণে দেশ ছাড়ে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর মা সোমালিয়ায় আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সাগাল চার ভাইয়ের সঙ্গে মায়ের হাত ধরে ব্রিটেনে আসেন। প্রথমদিকে ইংরেজি জানতেন না। পরিবারের নতুন জীবন শুরু হয় উত্তর লন্ডনের ক্যামডেন এলাকায়। সাত বছর বয়সে তিনি গসপেল ওক এলাকায় বসবাস শুরু করেন। ফুটবল ও খেলাধুলার মাধ্যমে অন্য শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার অভিজ্ঞতার কথাও তিনি পরে বলেছেন।
ক্যামডেনই হয়ে ওঠে তাঁর বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া শিশুটি পরবর্তী সময়ে সেই এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার রাজনৈতিক পথ বেছে নেন।
স্থানীয় সমাজকর্ম থেকে রাজনীতি
সাগালের রাজনৈতিক উত্থান এক দিনে ঘটেনি। স্থানীয় সমাজের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ক্যামডেনে ফিরে এসে কিংস ক্রস এলাকায় গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়তে দেখে তিনি উদ্বিগ্ন হন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে ২০১৫ সালে লেবার পার্টিতে যোগ দিতে উৎসাহিত করে।
২০২২ সালে তিনি ক্যামডেনের ক্যামডেন স্কয়ার ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। কাউন্সিলে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি আবাসন ও এলাকার উন্নয়নসংক্রান্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালে ক্যামডেনকে ‘বরো অব স্যাংচুয়ারি’ মর্যাদা অর্জনের পথে এগিয়ে নেওয়ার কাজেও তিনি ভূমিকা রাখেন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা।
২০২৬ সালের মে মাসে তিনি ক্যামডেন কাউন্সিলের নেতা হন। এর মাধ্যমে তিনি কাউন্সিলটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী নেতা হিসেবে ইতিহাস গড়েন। মাত্র কয়েক মাস পর জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনে লেবারের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
কেন এই উপনির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ?
আসনটি দীর্ঘদিন লেবার পার্টির নিয়ন্ত্রণে ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সেপ্টেম্বরে সংসদ সদস্য পদ ছাড়ার ঘোষণা দিলে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়। তবে এবার লেবারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল গ্রিন পার্টি, যার নেতা জ্যাক পোলানস্কি নিজেই প্রার্থী হয়েছিলেন।
গ্রিন পার্টির সাম্প্রতিক জনপ্রিয়তা, লন্ডনের স্থানীয় নির্বাচনে দলটির সাফল্য এবং গাজা ও ইসরায়েল নিয়ে দলীয় বিতর্কের মধ্যে এই ভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের আগে গ্রিন পার্টির সম্মেলনে জায়নবাদকে বর্ণবাদের সঙ্গে তুলনা করে একটি প্রস্তাব গৃহীত হওয়া নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। পোলানস্কি ওই প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত ছিলেন। তবে নির্বাচনী ফলের পেছনে এই বিতর্ক কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
পোলানস্কি পরাজয়ের পরও গ্রিন পার্টির নেতৃত্বে থাকার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, একটি নির্বাচনের ফল দিয়ে দলের বৃহত্তর আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না।
অন্যদিকে, সাগালের জয় লেবার পার্টিকে আসনটি ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। কিন্তু ভোটার উপস্থিতি ৩৮.৭৬ শতাংশে নেমে আসা নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। জয়ী প্রার্থী উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও মোট ভোটারের বড় অংশ ভোট দিতে আসেননি।
বিজয়ী ভাষণে পরিচয় ও প্রতিনিধিত্বের বার্তা
জয়ের পর সাগাল এমন মানুষের কথা তুলে ধরেন, যাঁরা নিজেদের চেহারা বা পরিচয়ের কারণে ব্রিটিশ সমাজে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন। তিনি বলেন, তাঁর বিজয় অন্যদেরও এই বার্তা দেবে যে তাঁরাও সমাজের অংশ এবং তাঁদেরও এগিয়ে যাওয়ার অধিকার রয়েছে।
নির্বাচনের আগে রিফর্ম ইউকের জিয়া ইউসুফ সাগালের ব্রিটিশ পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে। বিজয়ী ভাষণে সাগাল বিভাজন সৃষ্টিকারীদের সমালোচনা করেন এবং ক্যামডেনকে তাঁর নিজের বাড়ি ও ব্রিটেনের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা শিশু থেকে ক্যামডেন কাউন্সিলের নেতা, তারপর ব্রিটিশ সংসদের সদস্য—সাগাল আবদি-ওয়ালির এই যাত্রা অভিবাসন, স্থানীয় সম্পৃক্ততা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তাঁর সামনে এখন নতুন দায়িত্ব: সংসদে হলবর্ন ও সেন্ট প্যানক্রাসের মানুষের আবাসন, গৃহহীনতা, স্থানীয় সেবা এবং অন্যান্য জাতীয় নীতিসংক্রান্ত উদ্বেগ তুলে ধরা।