‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

সদ্যপ্রয়াত বলিউড অভিনেতা নানা : রয়ে গেলো অনেক কিছু অজানা

সদ্যপ্রয়াত বলিউড অভিনেতা নানা : রয়ে গেলো অনেক কিছু অজানা

ভয়েস অব পিপল বিনোদন ডেস্ক, ৯ অক্টোবর: 

নানা পাটেকরকে মনে পড়লে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, ভারী কণ্ঠ আর সংলাপ বলার সেই অনন্য ভঙ্গি। কখনো কঠোর, কখনো ক্ষুব্ধ, কখনো অসহায়—পর্দায় তাঁর চরিত্রগুলো যেন অভিনয় নয়, জীবন্ত হয়ে উঠত। কিন্তু পর্দার এই শক্তিমান অভিনেতার জীবনের এমন অনেক অধ্যায় রয়েছে, যা তাঁর কোটি কোটি দর্শকের কাছেও হয়তো পুরোপুরি জানা ছিল না।

৮ অক্টোবর ২০২৬ সকালে ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার ডোনা পাওলায় নিজের বাসভবনে মারা যান নানা পাটেকর। ভোরে অসুস্থ বোধ করার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। পরে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বক্তব্য অনুযায়ী, হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়াই মৃত্যুর কারণ।

কিন্তু নানা পাটেকরের জীবনকে শুধু ‘অভিনেতার জীবন’ বললে তাঁর গল্পের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়।

১৩ বছর বয়সে রোজগার শুরু

নানা পাটেকরের জন্মনাম বিশ্বনাথ পাটেকর। মহারাষ্ট্রের মুরুড-জঞ্জিরায় জন্ম নেওয়া এই মানুষটির শৈশব মোটেও স্বচ্ছল ছিল না। বাবার ব্যবসা ভেঙে যাওয়ার পর পরিবারকে কঠিন আর্থিক সংকটে পড়তে হয়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তাঁকে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে কাজ শুরু করতে হয়েছিল।

তিনি সিনেমার পোস্টার আঁকতেন। কাজটির জন্য মাসে পেতেন মাত্র ৩৫ রুপি এবং অনেক সময় একবেলা খাবারও মিলত। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছেন, কাজের জায়গায় যেতে তাঁকে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে যেতে হতো। একটি সাক্ষাৎকারের বর্ণনা অনুযায়ী, যাওয়া-আসায় তাঁর প্রতিদিন প্রায় ১৬ কিলোমিটার হাঁটা হতো।

যে বয়সে অন্য শিশুরা খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁকে চিনিয়ে দিয়েছিল ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও দায়িত্বের অর্থ।

পরবর্তী জীবনে নানা বলেছিলেন, সেই ক্ষুধা ও অপমানই তাঁর অভিনয়ের অন্যতম বড় শিক্ষক হয়ে উঠেছিল।

ছবির পোস্টার থেকে ছবির পর্দায়

চিত্রকলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল শৈশব থেকেই। তিনি মুম্বাইয়ের জে জে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড আর্টে পড়াশোনা করেন। পরে বাণিজ্যিক শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু তাঁর আসল আকর্ষণ ছিল মঞ্চ।

থিয়েটার তাঁকে অভিনয়ের ভাষা শিখিয়েছে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে সিনেমায় প্রবেশ।

১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক। প্রথমদিকে বড় তারকা হয়ে ওঠার সুযোগ আসেনি। কিন্তু ‘অঙ্কুশ’, ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি’, ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘রাজনীতি’, ‘ওয়েলকাম’সহ একের পর এক ছবিতে নিজের অভিনয়ের স্বাক্ষর রেখে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা।

‘পরিন্দা’র জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, ‘ক্রান্তিবীর’-এর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি এবং ‘অগ্নিসাক্ষী’র জন্য আবারও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—সব মিলিয়ে অভিনয়ের জন্য তিনি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।

অর্থাৎ ৩৫ রুপি মাসিক আয় করা পোস্টারশিল্পী থেকে জাতীয় পুরস্কার ও পদ্মশ্রী পাওয়া অভিনেতা—নানার জীবন ছিল এক দীর্ঘ উত্থানের গল্প।

শুধু ক্যামেরার সামনে নয়, ক্যামেরার পেছনেও

নানা শুধু অভিনেতা ছিলেন না। তিনি লেখক, পরিচালক এবং থিয়েটারকর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন।

১৯৯১ সালে তিনি পরিচালনা করেন ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’। ছবিটির জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে কঠোর প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিল তাঁকে। এই প্রশিক্ষণ তাঁর জীবনে অন্য একটি দরজা খুলে দেয়—সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আর শুধু সিনেমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

সত্যিই কি যুদ্ধের ময়দানে গিয়েছিলেন?

নানা পাটেকরকে নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত তথ্যগুলোর একটি তাঁর কার্গিল-সম্পর্কিত ভূমিকা।

১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি সেনাদের সঙ্গে সময় কাটান। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কারণে তিনি যুদ্ধকালীন সময়ে সেনাদের কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। কয়েকটি প্রতিবেদনে তাঁর প্রায় ৬০ দিন সেনাদের সঙ্গে থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর যুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সময়কাল ও দায়িত্বের বর্ণনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাই এটিকে সরাসরি ‘যুদ্ধে অংশ নেওয়া’ না বলে সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধাঞ্চলে সময় কাটানো হিসেবে উল্লেখ করাই বেশি সতর্ক ও তথ্যনির্ভর।

পরে তিনি ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মির সঙ্গে যুক্ত হন এবং সম্মানসূচক লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদাও পান।

অভিনয় নয়, অন্য ‘শুটিং’-এও ছিলেন দক্ষ

‘শুটিং’ শব্দটি চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে যেমন ক্যামেরার শুটিং বোঝায়, নানার ক্ষেত্রে এর আরেকটি অর্থ ছিল—রাইফেল শুটিং।

অভিনয়জীবনের অনেক পরে, চল্লিশের কোঠায় এসে তিনি রাইফেল শুটিংয়ের প্রতি গভীরভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রায় ৪৯ বছর বয়সে প্রতিযোগিতামূলক শুটিংয়ে অংশ নেওয়া শুরু করেন। ৫০ মিটার রাইফেল প্রোন এবং ৩০০ মিটার বিগ-বোর বিভাগে তিনি প্রতিযোগিতা করতেন।

২০০৪ সালে ইন্দোরে অনুষ্ঠিত ৪৮তম জাতীয় শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৩০০ মিটার বিগ-বোর বিভাগে তিনি রুপার পদক জেতেন। ২০০৭ সালে মহারাষ্ট্র দলের হয়ে দলগত ব্রোঞ্জও পান। ওই প্রতিযোগিতায় ৬০০-এর মধ্যে ৫৪৯ পয়েন্ট নিয়ে ৪৯ প্রতিযোগীর মধ্যে ১৩তম হয়েছিলেন। তাঁর পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে তাঁকে ‘রেনাউন্ড শট’ বা খ্যাতিমান শুটারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

অভিনয়ের বাইরে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় পদকজয়ী একজন শুটার ছিলেন—নানা পাটেকরের এই পরিচয়টি হয়তো তাঁর অভিনয় পরিচয়ের আড়ালেই থেকে গেছে।

রান্না ছিল আরেক ভালোবাসা

নানার আরেকটি অজানা বা কম আলোচিত দিক ছিল রান্না।

তিনি রান্না করতে ভালোবাসতেন। শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের রান্না করে খাওয়াতেও আনন্দ পেতেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি মজা করে বলেছিলেন, অভিনয়ের চেয়েও রান্নায় তিনি নিজেকে ভালো মনে করেন।

এই কথার মধ্যেও যেন তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি দিক ধরা পড়ে—তারকা হওয়ার পরও ঘরোয়া, সাধারণ জীবনের আনন্দের প্রতি তাঁর টান ছিল।

কৃষকের পাশে ‘নাম’

নানা পাটেকরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়গুলোর একটি সম্ভবত সিনেমার বাইরের এই অধ্যায়।

মহারাষ্ট্রের কৃষকদের দুর্দশা, আত্মহত্যা এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক সংকট তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ২০১৫ সালে অভিনেতা মকরন্দ আনাসপুরের সঙ্গে তিনি ‘নাম ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষক ও গ্রামীণ মানুষের সহায়তা, পানি সংরক্ষণ এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো ছিল এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

নিজের বিলাসবহুল গাড়ি কেনার জন্য জমিয়ে রাখা অর্থ কৃষকদের জন্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা নয়, পানি সংরক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি গ্রামীণ উন্নয়নের দিকেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

তাঁর আয়ের ‘৯০ শতাংশ দান করতেন’—এমন দাবি বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঘুরে বেড়িয়েছে। তবে এটি নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে প্রচলিত দাবি হিসেবেই দেখা উচিত। তাঁর সমাজসেবামূলক কাজের ব্যাপকতা অবশ্য একাধিক প্রতিবেদনে নথিভুক্ত হয়েছে।

‘নটসম্রাট’ থেকে ‘ওয়েলকাম’

নানা পাটেকরের অভিনয়ের বিস্তারও ছিল বিস্ময়কর।

একদিকে ‘নটসম্রাট’-এর মতো চরিত্রে গভীর আবেগ, অন্যদিকে ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠির মতো চরিত্রে হাস্যরস—দুই বিপরীত মেরুর অভিনয়েই তিনি দর্শকদের জয় করেছেন।

‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি’, ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘অপহরণ’, ‘রাজনীতি’, ‘ওয়েলকাম’—প্রতিটি ছবিতে তাঁর অভিনয়ের ধরন আলাদা। এটাই তাঁকে শুধু জনপ্রিয় নয়, বহুমাত্রিক অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

মানুষটি আসলে কেমন ছিলেন?

নানা পাটেকরের জনপরিচিতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর স্পষ্টবাদিতা। তিনি নিজেকে কখনো প্রচলিত অর্থে ‘বড় তারকা’ হিসেবে দেখাতে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর জীবনের শুরুটাই ছিল এমন এক বাস্তবতা দিয়ে, যেখানে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী।

তাই বিপুল সাফল্যের পরও সাধারণ মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অপরিচিত ছিল না।

একসময় যিনি ৩৫ রুপির জন্য সিনেমার পোস্টার আঁকতেন, তিনিই পরে সেই সিনেমার পোস্টারে নিজের মুখ দেখেছেন। এই বৈপরীত্যই হয়তো নানার জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী গল্প।

পর্দা নামল, গল্প রয়ে গেল

নানা পাটেকরের মৃত্যুতে ভারতীয় সিনেমা হারাল এক স্বতন্ত্র অভিনেতাকে। কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকার শুধু চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ নয়।

এক কিশোর পোস্টারশিল্পী থেকে অভিনেতা; মঞ্চের কর্মী থেকে জাতীয় পুরস্কারজয়ী শিল্পী; অভিনেতা থেকে পরিচালক; সিনেমার পর্দা থেকে সেনাদের পাশে; চল্লিশের কোঠায় এসে জাতীয় পর্যায়ের শুটার; আর শেষ পর্যন্ত কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক সমাজকর্মী—নানা পাটেকরের জীবন যেন একই মানুষের ভেতরে বহু মানুষের গল্প।

খ্যাতি তাঁকে বদলে দেয়নি—অন্তত তাঁর জীবনের অনেক অধ্যায় তারই সাক্ষ্য দেয়।

সিনেমার পর্দায় তাঁর কণ্ঠ আর শোনা যাবে না। নতুন কোনো চরিত্রে তাঁকে দেখা যাবে না। কিন্তু একজন ১৩ বছরের ছেলের হাতে ধরা পোস্টার তোলার তুলি থেকে যে গল্প শুরু হয়েছিল, তা ভারতীয় সিনেমা ও সমাজজীবনের ইতিহাসে অনেক দিন ধরে রয়ে যাবে।

নানা চলে গেলেন। কিন্তু নানার গল্প শেষ হলো না।