ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বিদ্বেষমূলক অপরাধ ১ লাখ ৪৬ হাজার, মুসলিমবিদ্বেষী ৫ হাজারের বেশি

ব্রিটেনে মুসলিমবিদ্বেষ ও বর্ণবাদী অপরাধ রেকর্ড পর্যায়ে, এক বছরে বেড়েছে ১৫ শতাংশ

ব্রিটেনে মুসলিমবিদ্বেষ ও বর্ণবাদী অপরাধ রেকর্ড পর্যায়ে, এক বছরে বেড়েছে ১৫ শতাংশ

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৯ অক্টোবর  :

ব্রিটেনে বর্ণবাদী ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া এক বছরে পুলিশ মোট ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮২৫টি বিদ্বেষমূলক অপরাধ নথিভুক্ত করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বর্ণবাদী অপরাধ বেড়েছে ৯ শতাংশ এবং ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধ ১৩ শতাংশ। মুসলিমদের লক্ষ্য করে সংঘটিত অপরাধের সংখ্যা এক বছরে ১৫ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ১৩২টিতে দাঁড়িয়েছে। ইহুদিদের লক্ষ্য করে অপরাধও বেড়েছে ১০ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বর্ণবাদী অপরাধ ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ১ লাখ ৭ হাজার ৯২৬টি বর্ণবাদী বিদ্বেষমূলক অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। আগের বছরে এ সংখ্যা ছিল ৯৮ হাজার ৮৯০। অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে ৯ হাজারের বেশি ঘটনা।

নথিভুক্ত মোট বিদ্বেষমূলক অপরাধের প্রায় ৭৪ শতাংশই বর্ণবাদ-সম্পর্কিত। অপরাধের মধ্যে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা এবং শারীরিক আঘাত ছাড়া হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। সরকারি পরিসংখ্যানে জনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত অপরাধ ১০ শতাংশ এবং শারীরিক আঘাত ছাড়া হামলা ১০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানানো হয়েছে।

তবে এই পরিসংখ্যান শুধু ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের পুলিশের নথিভুক্ত ঘটনা নিয়ে তৈরি। স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের তথ্য এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপরাধ বেড়েছে ১৫ শতাংশ

ধর্মীয় বিদ্বেষের ক্ষেত্রে মুসলিমরা সবচেয়ে বেশি নথিভুক্ত ঘটনার শিকার হয়েছেন। ২০২৪-২৫ সালে মুসলিমদের লক্ষ্য করে ৪ হাজার ৪৭৯টি অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছিল। ২০২৫-২৬ সালে তা বেড়ে ৫ হাজার ১৩২টিতে দাঁড়িয়েছে।

একই সময়ে ইহুদিদের লক্ষ্য করে অপরাধ ২ হাজার ৮৭৪ থেকে বেড়ে ৩ হাজার ১৬২টি হয়েছে। খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে অপরাধ বেড়ে ৬২৪টি এবং হিন্দুদের লক্ষ্য করে অপরাধ বেড়ে ২১০টি হয়েছে। শিখদের লক্ষ্য করে অপরাধের সংখ্যা ছিল ২৬৭টি।

ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধের মোট সংখ্যা ১০ হাজার ৬৭ থেকে বেড়ে ১১ হাজার ৪১৯ হয়েছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে অপরাধের বৃদ্ধির হার ছিল ১৫ শতাংশ।

সরকারি পরিসংখ্যানে কোনো ব্যক্তির ধর্ম সম্পর্কে পুলিশের ধারণার ভিত্তিতে অপরাধের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। তাই এগুলো নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা; ব্রিটেনে সংঘটিত সব মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়।

রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর এবং ২০২৬ সালের মার্চে মুসলিমদের লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক অপরাধের সংখ্যা বেড়েছিল। সেপ্টেম্বরের বৃদ্ধি বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি ও জনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত ঘটনার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। ২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরুর পরও এ ধরনের অপরাধের সংখ্যা বাড়ে।

২০২৪ সালের আগস্টে দক্ষিণপোর্টে শিশুদের ওপর হামলার ঘটনার পর ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে দাঙ্গা ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই সময় মুসলিম ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ঘটনার বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা যায়। সরকারি বিশ্লেষণে এসব সময়ের সঙ্গে অপরাধ বৃদ্ধির সম্পর্ক তুলে ধরা হলেও প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ এক নয়।

মসজিদ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

দ্য গার্ডিয়ান-এর ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের একটি পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, মসজিদকে কেন্দ্র করে ৬৪টি মসজিদ-সংশ্লিষ্ট ৭৮টি বিদ্বেষমূলক ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ঘটনাকে গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে; কিছু ঘটনায় হুমকি, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে।

এ ধরনের ঘটনা শুধু মসজিদের সম্পত্তির ক্ষতি করে না; মুসল্লি, ধর্মীয় নেতা এবং স্থানীয় পরিবারের নিরাপত্তাবোধেও প্রভাব ফেলে। তবে ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের পর্যবেক্ষণ এবং পুলিশের সরকারি পরিসংখ্যান আলাদা তথ্যভিত্তি থেকে তৈরি, তাই দুটির সংখ্যা একসঙ্গে যোগ করে মোট অপরাধ নির্ধারণ করা যাবে না।

সব ধরনের বিদ্বেষমূলক অপরাধ বাড়েনি

সামগ্রিকভাবে বিদ্বেষমূলক অপরাধ বাড়লেও সব শ্রেণিতে একই প্রবণতা দেখা যায়নি। ২০২৫-২৬ সালে যৌন অভিমুখিতার কারণে সংঘটিত বিদ্বেষমূলক অপরাধ ১ শতাংশ, প্রতিবন্ধিতার কারণে ৫ শতাংশ এবং ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ের কারণে ৪ শতাংশ কমেছে।

সরকারি হিসাবে, বিদ্বেষমূলক অপরাধের অর্ধেকের কিছু বেশি জনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত এবং প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতাসংক্রান্ত অপরাধ। এই দুই শ্রেণি মিলিয়ে মোট নথিভুক্ত ঘটনার ৯৩ শতাংশের বেশি।

প্রকৃত চিত্র আরও বড় হতে পারে

বিশেষজ্ঞদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো, পুলিশের নথিভুক্ত অপরাধ আর বাস্তবে ঘটে যাওয়া সব বিদ্বেষমূলক ঘটনা এক নয়। সব ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন না। আবার পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হলেও প্রতিটি ঘটনা বিদ্বেষমূলক অপরাধ হিসেবে নথিভুক্ত হয় না।

এ ছাড়া মেট্রোপলিটন পুলিশের অপরাধ নথিভুক্তির পদ্ধতিতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এ কারণে লন্ডনের তথ্য আগের বছরগুলোর সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা কঠিন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বিশ্লেষণের সময় মেট পুলিশের তথ্য বাদ দিয়ে আলাদা হিসাবও প্রকাশ করেছে। সেই হিসাবেও বর্ণবাদী ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধের সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে।

ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি ও অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এই পরিসংখ্যান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বর্ণবাদী অপমান, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হয়রানি, অনলাইন হুমকি কিংবা মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার আশঙ্কা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।

কোনো ব্যক্তি বর্ণবাদী বা ধর্মীয় বিদ্বেষের শিকার হলে ঘটনার সময়, স্থান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিবরণ এবং প্রাসঙ্গিক বার্তা বা ছবি সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি বিপদের ক্ষেত্রে ৯৯৯ নম্বরে এবং জরুরি নয় এমন ঘটনায় পুলিশের ১০১ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়। অনলাইনেও পুলিশের মাধ্যমে অভিযোগ জানানো সম্ভব।

সরকারি পরিসংখ্যানের মূল বার্তা হলো, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বিদ্বেষমূলক অপরাধের সংখ্যা আবারও বেড়েছে এবং বর্ণবাদ ও ধর্মীয় বিদ্বেষের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এই প্রবণতা মোকাবিলায় অপরাধের সঠিক তদন্ত, ভুক্তভোগীদের সহায়তা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।