তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
লন্ডনে এক মাসে ফোন চুরির ঘটনায় ৭০০ গ্রেপ্তার, প্রতিদিন ১০০টির বেশি ইলেকট্রনিক ট্যাগ ভঙ্গ
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৯ অক্টোবর :
লন্ডনে মোবাইল ফোন চুরি ও ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের বিশেষ অভিযানে এক মাসে ৭০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে শত শত সন্দেহভাজন চোরাই ফোন। তবে একই সময়ে অপরাধীদের ওপর ইলেকট্রনিক নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার স্যার মার্ক রাউলি জানিয়েছেন, লন্ডনে প্রতিদিন ১০০টির বেশি ইলেকট্রনিক ট্যাগ ভঙ্গের ঘটনা পুলিশের কাছে পাঠানো হচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, অপরাধীদের নজরদারির শর্ত ভঙ্গের পরও যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

এক মাসে ৭০০-এর বেশি গ্রেপ্তার
মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফোন চুরি, ছিনতাই এবং চোরাই মালামাল কেনাবেচার অভিযোগে ৭০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফোন চুরির অপরাধী থেকে শুরু করে চোরাই ফোনের ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের সদস্যদের শনাক্ত করতে পরিচালিত এই অভিযান ছিল পুলিশের এ ধরনের সবচেয়ে বড় অভিযান।
অভিযানে ৫০টির বেশি তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়। চোরাই ফোন কেনাবেচার সন্দেহে লন্ডনের ২২০টি ব্যবহৃত ফোনের দোকানে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন কর্মকর্তারা। এ ছাড়া মাদক, ছুরি, আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ এবং ১১০টির বেশি অবৈধ বৈদ্যুতিক বাইক জব্দ করা হয়।
পুলিশের প্রকাশিত একটি ঘটনায় দেখা যায়, বৈদ্যুতিক বাইকে পালিয়ে যাওয়া এক সন্দেহভাজন একটি পুকুরে ঝাঁপ দেন। পালানোর সময় তিনি কয়েকটি ফোন ফেলে দেন। পুলিশ পুকুর থেকে টিনের ফয়েলে মোড়ানো ছয়টি ফোন উদ্ধার করে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ফোন ফয়েলে মুড়িয়ে রাখার একটি উদ্দেশ্য হলো সংকেত আটকে দিয়ে ফোনের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন করে তোলা।
অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আগেও অপরাধে জড়িত ছিলেন, এমন সন্দেহভাজনও রয়েছেন। তবে গ্রেপ্তার হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।
চার বছরের মধ্যে আগস্টে ফোন চুরি সবচেয়ে কম
পুলিশের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের আগস্টে লন্ডনে ফোন চুরি ও ছিনতাইয়ের ৩ হাজার ৯৬৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২২ সালের আগস্টে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩১১। ফলে ২০২২ সালের পর আগস্ট মাসের হিসাবে এবারের সংখ্যা সবচেয়ে কম নয়—বরং সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী এটি চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ আগস্টের তুলনায় নিম্নতম নয়। পুলিশের দাবিটি হলো, আগস্টের ঘটনাসংখ্যা ২০২২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে; প্রকাশিত সংখ্যার সঙ্গে এই দাবির অসংগতি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে পুলিশের মূল পরিসংখ্যান পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ফোন চুরি ও ছিনতাইয়ের মোট ঘটনা ছিল ৩৯ হাজার ৭৯৩টি। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৩৬। অর্থাৎ এক বছরে ঘটনা কমেছে ৯ হাজার ৩৪৩টি, প্রায় ১৯ শতাংশ।
লন্ডনের পর্যটনকেন্দ্র ওয়েস্টমিনস্টারে ফোন চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মেয়র সাদিক খানও বলেছেন, গত এক বছরে লন্ডনে ১৬ হাজার কম ফোন চুরি হয়েছে।
প্রতিদিন ১০০টির বেশি ইলেকট্রনিক ট্যাগ ভঙ্গ
ফোন চুরির বিরুদ্ধে অভিযানের পাশাপাশি অপরাধীদের ইলেকট্রনিক নজরদারি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন মেট পুলিশের কমিশনার স্যার মার্ক রাউলি।
৮ অক্টোবর এলবিসি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, লন্ডনে প্রতিদিন ১০০টির বেশি ইলেকট্রনিক ট্যাগ ভঙ্গের ঘটনা পুলিশকে জানানো হচ্ছে এবং সংখ্যাটি বাড়ছে।
কারাগার থেকে আগাম মুক্তি পাওয়া কিছু অপরাধীকে পুনরায় অপরাধে জড়ানো বা মুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে গ্রেপ্তার করতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি। আগস্টের শুরু থেকে প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিনজন আগাম মুক্তি পাওয়া অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে।
রাউলির বক্তব্য অনুযায়ী, ট্যাগ ভঙ্গের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ৯৫ শতাংশের বেশি একই শর্তে আবার জামিনে ছাড়া পাচ্ছেন। তাঁর মতে, শর্ত ভঙ্গের পর কার্যকর পরিণতি না থাকলে ইলেকট্রনিক নজরদারির উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। তবে এটি পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য; সব ধরনের ট্যাগ ভঙ্গের ঘটনায় একই ফল হয়, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পূর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
কারাগারে অতিরিক্ত চাপ, আগাম মুক্তি নিয়ে বিতর্ক
যুক্তরাজ্যে কারাগারের অতিরিক্ত বন্দিচাপ কমাতে সরকার ধাপে ধাপে বন্দিদের আগাম মুক্তির ব্যবস্থা নিয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় আগামী এক বছরে প্রায় ৫ হাজার বন্দিকে বিভিন্ন পর্যায়ে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের নীতিতে আগাম মুক্তি পাওয়া বন্দিদের ইলেকট্রনিক ট্যাগের আওতায় রাখার কথা থাকলেও বিচারবিষয়ক মন্ত্রী অ্যালেক্স নরিস ৪ অক্টোবর জানিয়েছিলেন, সদ্য মুক্তি পাওয়া কতজন বন্দির শরীরে ট্যাগ লাগানো হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য সংখ্যা তখনও তাঁর কাছে ছিল না।
এদিকে প্রবেশন ব্যবস্থার পরিদর্শকদের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে অপরাধীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইলেকট্রনিক ট্যাগ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাগানো হচ্ছে না। এতে যেসব ভুক্তভোগী অপরাধীদের কাছ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়েছেন, তাঁদের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
চোরাই ফোন পাচারেও আন্তর্জাতিক চক্র
ফোন চুরির সঙ্গে আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের যোগসূত্রও পেয়েছে লন্ডন পুলিশ। মেট পুলিশের তদন্তে যুক্তরাজ্য থেকে চীনে প্রায় ৪০ হাজার চোরাই মোবাইল ফোন পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার ঘটনায় তিন ব্যক্তিকে গত ২৫ সেপ্টেম্বর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পুলিশের ধারণা, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে লন্ডনে চুরি হওয়া ফোনের প্রায় ৪০ শতাংশের সঙ্গে এই পাচারচক্রের যোগসূত্র ছিল।
চোরাই ফোনের বাজার বন্ধ করতে পুলিশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের সঙ্গেও তথ্য বিনিময় করছে। পাশাপাশি চুরি হওয়া ফোনের অবস্থান শনাক্ত করা গেলে দ্রুত তল্লাশির পরোয়ানা পাওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের সতর্কবার্তা, ফোন চুরির পর প্রতারকেরা নিজেদের পুলিশ বা ফোন কোম্পানির প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। তারা ফোনের পাসওয়ার্ড, অ্যাকাউন্টের তথ্য বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। প্রকৃত পুলিশ, অ্যাপল বা বৈধ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা ফোনের পাসওয়ার্ড জানতে চাইবে না।
পুলিশের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ
লন্ডনে ফোন চুরি কমাতে বিশেষ অভিযান, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অপরাধীদের ইলেকট্রনিক নজরদারির শর্ত ভঙ্গের ঘটনা পুলিশের জন্য বাড়তি কাজ তৈরি করছে।
একদিকে চোরাই ফোনের বাজার বন্ধ করা, অন্যদিকে আগাম মুক্তি পাওয়া অপরাধীদের ওপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা—দুটি ক্ষেত্রেই পুলিশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অপরাধের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি নজরদারির শর্ত ভঙ্গের ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।