তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
ব্রিটেনের নতুন বাজেটে কর, জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয়: বাংলাদেশি পরিবারগুলোর সামনে কী অপেক্ষা করছে?
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৯ অক্টোবর :
ব্রিটেনের আসন্ন বাজেটে কর, জ্বালানির দাম ও সরকারি সহায়তা নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত আসতে পারে, তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর মাসিক খরচে। বিশেষ করে যেসব পরিবার ভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ, যাতায়াত, শিশুর দেখাশোনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি ব্যয়ের চাপে রয়েছে, তাদের জন্য বাজেটের কয়েকটি সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এখনো বাজেট ঘোষণা হয়নি। চ্যান্সেলর জন হিলি আগামী ২৮ অক্টোবর তাঁর প্রথম বাজেট উপস্থাপন করবেন। ফলে কর বাড়ানো, নতুন জ্বালানি সহায়তা কিংবা অন্য কোনো সুবিধা চালুর বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

জ্বালানি বিল: সামান্য স্বস্তি, কিন্তু ব্যয় এখনো বেশি
ব্রিটেনে শীতের আগে গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল পরিবারগুলোর অন্যতম বড় উদ্বেগ। জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফজেমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাধারণ ভেরিয়েবল ট্যারিফে থাকা এবং সরাসরি ব্যাংক থেকে বিল পরিশোধ করা একটি আদর্শ পরিবারের বার্ষিক হিসাবের জ্বালানি মূল্যসীমা ৪ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে সরকার বিদ্যুতের বিলে সাময়িকভাবে ভ্যাট তুলে নিলেও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি দূর হচ্ছে না।
সরকার ১ অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত গৃহস্থালি বিদ্যুতের বিল থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করেছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এতে অফজেমের মূল্যসীমার আওতায় থাকা একটি আদর্শ পরিবারের বছরে প্রায় ৪৫ পাউন্ড সাশ্রয় হতে পারে। গত বাজেটের অন্যান্য পদক্ষেপে জ্বালানি বিল থেকে প্রায় ১৫০ পাউন্ডের ব্যয় কমানোর কথাও জানিয়েছে সরকার। তবে প্রকৃত সাশ্রয় নির্ভর করবে পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ, ট্যারিফ ও সরবরাহকারীর বিলের ওপর। গ্যাসের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ভ্যাট বহাল রয়েছে।
বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য এর অর্থ হলো, বিদ্যুতের বিলে কিছুটা স্বস্তি মিললেও শীতকালে ঘর গরম রাখা, গরম পানি ব্যবহার ও রান্নার ব্যয় নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বড় পরিবারে সদস্যসংখ্যা বেশি হলে কিংবা ঘরে শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ কেউ থাকলে জ্বালানি ব্যবহার কমানোও সব সময় সহজ নয়।
আসন্ন বাজেটে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য অতিরিক্ত জ্বালানি সহায়তার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এই সহায়তা চালু হবে কি না, কারা যোগ্য হবেন এবং কত টাকা পাওয়া যাবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা নেই।
কর বাড়বে কি? পরিবারগুলোর নজর আয় ও সঞ্চয়ের ওপর
বাজেটের আগে কর বাড়ানো নিয়ে আলোচনা চলছে। সরকারের সামনে একদিকে সরকারি ব্যয় ও ঋণের চাপ সামলানো, অন্যদিকে পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও সরকারি ঋণ নেওয়ার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজেটের আর্থিক অবকাশও চাপের মুখে রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে আয়কর, কর্মীদের জাতীয় বিমা-চাঁদা বা ভ্যাটের মূল হার বাড়ানো হবে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা করা হয়নি। সম্ভাব্য কর পরিবর্তন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও সেগুলোকে নিশ্চিত নীতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশি পরিবারের ক্ষেত্রে করের প্রভাব নির্ভর করবে পরিবারের সদস্যদের আয়, চাকরির ধরন, করযোগ্য আয় এবং সঞ্চয়ের ওপর। আয়করের সীমা বা করের নিয়ম পরিবর্তিত হলে হাতে পাওয়া অর্থের পরিমাণে প্রভাব পড়তে পারে। আবার কোনো কর অপরিবর্তিত থাকলেও মজুরি, ভাড়া, খাবার ও পরিবহনের ব্যয় বাড়লে পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
তাই বাজেটের পর শুধু করের হার নয়, করমুক্ত আয়ের সীমা, জাতীয় বিমা-চাঁদা, বিভিন্ন ভাতা এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্যও খেয়াল করা প্রয়োজন।
বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের জন্য কী গুরুত্বপূর্ণ?
বাড়ির খরচ অনেক বাংলাদেশি পরিবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ। যাঁরা বাড়ি কেনার ঋণ পরিশোধ করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে সুদের হার ও মাসিক মর্টগেজ কিস্তি গুরুত্বপূর্ণ। আর ভাড়াটিয়াদের জন্য ভাড়া, কাউন্সিল ট্যাক্স, জ্বালানি বিল ও যাতায়াতের সম্মিলিত ব্যয় নির্ধারণ করে মাস শেষে কত টাকা হাতে থাকবে।
আসন্ন বাজেটে উচ্চমূল্যের বাড়ির ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের সীমা পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে ইংল্যান্ডে ২০২৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০ লাখ পাউন্ড বা তার বেশি মূল্যের আবাসিক সম্পত্তির ওপর প্রস্তাবিত উচ্চমূল্যের কাউন্সিল ট্যাক্স সারচার্জ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এই সীমা কমানো হবে কি না, তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু ৯ অক্টোবর পর্যন্ত নতুন বাজেটে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে উচ্চমূল্যের বাড়ির মালিকদের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে এটিকে সাধারণ ভাড়াটিয়াদের জন্য সরাসরি নতুন কর হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বাড়ির মালিকের অতিরিক্ত ব্যয় ভাড়ার ওপর প্রভাব ফেলবে কি না, সেটিও নির্ভর করবে বাজার পরিস্থিতি ও বাড়িওয়ালার সিদ্ধান্তের ওপর।
খাবার, পরিবহন ও দৈনন্দিন খরচ
বাংলাদেশি পরিবারের অনেকেই নিয়মিত সুপারমার্কেটের বাজার, কর্মস্থলে যাতায়াত, শিশুদের স্কুল-সংক্রান্ত খরচ এবং পরিবারের দেশে টাকা পাঠানোর ব্যয় সামলান। বাজেটে কর, সরকারি সহায়তা কিংবা পরিবহন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এ খরচগুলোর কিছু অংশে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাজেটের সিদ্ধান্তেই একমাত্র নির্ধারিত হয় না। জ্বালানির আন্তর্জাতিক দাম, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা, মজুরি ও পাউন্ডের বিনিময়মূল্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাজেটে কোনো কর কমানো হলেই বাজারে সব পণ্যের দাম কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
সরকার বাসভাড়া নিয়ন্ত্রণসহ জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর কয়েকটি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। কিন্তু নতুন বাজেটে এসব ব্যবস্থার পরিধি বাড়বে কি না, তা ঘোষণার পরই স্পষ্ট হবে।
শিশু, কর্মজীবী ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য কী দেখার বিষয়?
বাংলাদেশি পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থান একরকম নয়। দুইজন কর্মজীবী সদস্য থাকা পরিবার, একক অভিভাবকের পরিবার, স্বনিয়োজিত ব্যক্তি, শিক্ষার্থী এবং অবসরপ্রাপ্তদের ওপর একই সিদ্ধান্তের প্রভাবও ভিন্ন হতে পারে।
বাজেটে যেসব বিষয় বিশেষভাবে নজরে রাখা প্রয়োজন:
- জ্বালানি সহায়তা: নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য অতিরিক্ত সাহায্য ঘোষণা হয় কি না এবং যোগ্যতার শর্ত কী থাকে।
- আয়কর ও জাতীয় বিমা-চাঁদা: করের সীমা বা নিয়মে পরিবর্তন হলে হাতে পাওয়া আয়ের ওপর কী প্রভাব পড়ে।
- শিশু ও পরিবারভিত্তিক সুবিধা: বিদ্যমান ভাতা বা সহায়তার পরিমাণ ও যোগ্যতার নিয়মে পরিবর্তন আসে কি না।
- পরিবহন ব্যয়: বাসভাড়া ও জ্বালানির খরচ কমানোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকে কি না।
- বাসস্থান: উচ্চমূল্যের সম্পত্তি-সংক্রান্ত করের প্রস্তাব এবং বাড়ি কেনা বা ভাড়া নেওয়ার খরচে সম্ভাব্য প্রভাব।
এসব বিষয়ে সরকারি ঘোষণা না আসা পর্যন্ত পরিবারগুলোর উচিত সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা, কিন্তু কেবল গুজব বা বাজেট-পূর্ব অনুমানের ভিত্তিতে বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া।
বাংলাদেশি পরিবারগুলোর এখন করণীয়

বাজেট ঘোষণার আগে পরিবারগুলো নিজেদের মাসিক আয় ও ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করতে পারে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল, ভাড়া বা মর্টগেজ, যাতায়াত, খাবার, ঋণ এবং দেশে টাকা পাঠানোর খরচ আলাদা করে হিসাব রাখলে কোন খাতে চাপ সবচেয়ে বেশি, তা বোঝা সহজ হবে।
জ্বালানি বিলের ক্ষেত্রে বর্তমান ট্যারিফ ও বিকল্প সরবরাহকারীর প্রস্তাব তুলনা করা যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট ট্যারিফে যাওয়ার আগে চুক্তির মেয়াদ, বাতিলের শর্ত ও সম্ভাব্য অতিরিক্ত চার্জ পরীক্ষা করা জরুরি। সরকারি সহায়তার যোগ্যতা থাকলে সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা যাচাই করে আবেদন করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২৮ অক্টোবরের বাজেট ঘোষণার পর আয়কর, জ্বালানি সহায়তা, ভাতা ও আবাসন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের মূল নথি দেখে নিজের পরিবারের ওপর প্রকৃত প্রভাব হিসাব করা।
ব্রিটেনের আসন্ন বাজেট বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কর ও সরকারি সহায়তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মাসিক আয়, জ্বালানি বিল ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়। বিদ্যুতের বিলে সাময়িক ভ্যাট-ছাড় ইতিমধ্যে কার্যকর হলেও অতিরিক্ত জ্বালানি সহায়তা এবং সম্ভাব্য কর পরিবর্তনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বাজেটের প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে ২৮ অক্টোবরের ঘোষণার পর।