তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

ব্রিটেনের এনএইচএসে এডিএইচডি ও অটিজম সেবার সংকট, উদ্বিগ্ন বাংলাদেশি পরিবার

ব্রিটেনের এনএইচএসে এডিএইচডি ও অটিজম সেবার সংকট, উদ্বিগ্ন বাংলাদেশি পরিবার

ভয়েস অব পিপল স্বাস্থ্য ডেস্ক, ৯ অক্টোবর :

ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এনএইচএসে এডিএইচডি ও অটিজম শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে লাখ লাখ মানুষকে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক চাপ বাড়ছে, স্কুল ও পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হিমশিম খাচ্ছে, আর দ্রুত মূল্যায়নের আশায় অনেক পরিবারকে বেসরকারি সেবার দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ইংল্যান্ডের মানসিক স্বাস্থ্য, এডিএইচডি ও অটিজম সেবার ওপর নতুন এক সরকারি পর্যালোচনা বিদ্যমান ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। পর্যালোচনাটিতে বলা হয়েছে, দ্রুত সংস্কার না হলে সেবাব্যবস্থা আরও গুরুতর সংকটে পড়তে পারে।

ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্যও এই সংকট গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু বা প্রাপ্তবয়স্কের এডিএইচডি কিংবা অটিজম মূল্যায়নের প্রয়োজন হলে দীর্ঘ অপেক্ষা, স্কুলে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং বেসরকারি মূল্যায়নের ব্যয় পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। আনুষ্ঠানিক রোগ নির্ণয়ের অপেক্ষায় সন্তানের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনের সহায়তা আটকে গেলে তার প্রভাব পুরো পরিবারের ওপর পড়ে। তাই এনএইচএসের সেবাব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসছে, তা বাংলাদেশি অভিভাবকদেরও জানা প্রয়োজন।

মূল্যায়নের অপেক্ষায় ৮ লাখের বেশি মানুষ

অধ্যাপক পিটার ফোনাগির নেতৃত্বে পরিচালিত ৬০৭ পৃষ্ঠার পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইংল্যান্ডে ৫ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ এডিএইচডি মূল্যায়নের অপেক্ষায় ছিলেন। অটিজম নির্ণয়ের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন আরও প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার মানুষ। দুই বিভাগ মিলিয়ে সংখ্যাটি ৮ লাখ ছাড়িয়ে যায়। অপেক্ষমাণদের প্রায় ৯০ শতাংশকে অন্তত তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ।

এদিকে এনএইচএস ইংল্যান্ডের সর্বশেষ প্রকাশিত অটিজম-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুনে অটিজম সন্দেহে খোলা রেফারেলের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৯৪ হাজার ৭৯২। এর মধ্যে ২ লাখ ৫৬ হাজার ১৭ জনের রেফারেল অন্তত ১৩ সপ্তাহ ধরে খোলা ছিল। ১৩ সপ্তাহের বেশি অপেক্ষমাণ রোগীদের মধ্যে ওই মাসে মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রথম সেবাসংক্রান্ত সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। উল্লেখ্য, রেফারেলের সংখ্যা মানেই নিশ্চিতভাবে অটিজম শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা নয়। 

এই পরিসংখ্যানের অর্থ, সমস্যাটি কেবল রোগ নির্ণয়ে বিলম্বের নয়। দীর্ঘ অপেক্ষার সময় শিশুদের পড়াশোনা, সামাজিক যোগাযোগ, আচরণগত সমস্যা মোকাবিলা এবং পরিবারের দৈনন্দিন জীবনেও চাপ তৈরি হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ, সময় ব্যবস্থাপনা ও সম্পর্কের সমস্যার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতেও বিলম্ব হতে পারে।

এডিএইচডি ও অটিজম কী?

এডিএইচডি বা অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার একটি স্নায়ুবিকাশজনিত অবস্থা। এর সঙ্গে মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা, অতিরিক্ত অস্থিরতা কিংবা আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে সমস্যার সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে এসব লক্ষণ থাকলেই কারও এডিএইচডি আছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না; যথাযথ ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন প্রয়োজন।

অটিজমও একটি স্নায়ুবিকাশজনিত অবস্থা। অটিস্টিক ব্যক্তিদের সামাজিক যোগাযোগ, সংবেদনশীলতা, আচরণ ও দৈনন্দিন রুটিনের ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। প্রত্যেক ব্যক্তির অভিজ্ঞতা ও সহায়তার প্রয়োজন এক নয়।

দুটি অবস্থাই শৈশবে শনাক্ত হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দেয়। সঠিক মূল্যায়ন, উপযুক্ত শিক্ষা-সহায়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা বা অন্যান্য সেবা অনেকের জীবনকে সহজ করতে পারে।

কেন বাড়ছে চাহিদা?

সরকারি পর্যালোচনায় এডিএইচডি ও অটিজম নিয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি, আগে শনাক্ত না হওয়া ব্যক্তিদের সামনে আসা এবং মূল্যায়নের চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়গুলো উঠে এসেছে। বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের মধ্যে আগে যেসব লক্ষণ সহজে শনাক্ত হতো না, তাঁদের কেউ কেউ এখন মূল্যায়নের জন্য সেবা চাইছেন।

তবে পর্যালোচনাটি বলছে, মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার বৃদ্ধি শুধু সচেতনতা বাড়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আবাসন ব্যয়, অনিরাপদ কর্মসংস্থান এবং সামাজিক চাপও মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলছে।

পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, ১৬ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে সাধারণ মানসিক সমস্যার হার ১৯৯৩ সালের ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ২২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় প্রতি ছয়জনে একজন থেকে বেড়ে প্রতি চারজনে একজন হয়েছে। এসব তথ্য মানসিক স্বাস্থ্যের বিস্তৃত পরিস্থিতি তুলে ধরে; এগুলো এডিএইচডি বা অটিজমের হার নয়।

রোগ নির্ণয় ছাড়া সহায়তা নয়—বর্তমান ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা

পর্যালোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক রোগ নির্ণয় না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকায় থাকা শিশু ও পরিবারগুলোকে কার্যত সহায়তাহীন অবস্থায় থাকতে হয়।

একটি শিশুর মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা হচ্ছে, স্কুলে আচরণগত সমস্যা দেখা দিচ্ছে কিংবা সামাজিক যোগাযোগে বাড়তি সহায়তা প্রয়োজন—এমন পরিস্থিতিতে সমস্যার ধরন বুঝে সহায়তা শুরু করা সম্ভব হওয়া উচিত। কিন্তু রোগ নির্ণয়ের কাগজ না থাকায় স্কুল, পরিবার বা অন্যান্য সেবার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে দেরি হতে পারে।

এই সমস্যার সমাধানে পর্যালোচনাটি রোগ নির্ণয়নির্ভর ব্যবস্থা থেকে প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তার দিকে যাওয়ার সুপারিশ করেছে। অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিক রোগ নির্ণয়ের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা চললেও ব্যক্তির বাস্তব সমস্যার ভিত্তিতে যত দ্রুত সম্ভব উপযুক্ত সহায়তা দেওয়া হবে।

বেসরকারি ক্লিনিক নিয়েও উদ্বেগ

এনএইচএসে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেক পরিবার বেসরকারি ক্লিনিকে এডিএইচডি বা অটিজম মূল্যায়ন করাচ্ছে। কিন্তু সরকারি পর্যালোচনায় বেসরকারি মূল্যায়নের মান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পদ্ধতিগত সামঞ্জস্য এবং আর্থিক প্রণোদনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি এ ধরনের সেবা প্রদানকারী সব ক্লিনিককে কেয়ার কোয়ালিটি কমিশনের নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা এবং সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি এডিএইচডি ও অটিজম মূল্যায়নের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বেসরকারি মূল্যায়ন মানেই ভুল—এমন সিদ্ধান্ত পর্যালোচনাটি দেয়নি। বরং মূল্যায়নের মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং মানুষ যেন বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে অপ্রয়োজনীয় বা যথাযথভাবে পরিচালিত নয় এমন সেবার দিকে না যায়, সেটি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। 

অতিরিক্ত রোগ নির্ণয়ের ঝুঁকি নিয়েও সতর্কতা

পর্যালোচনায় এডিএইচডি ও অটিজম নির্ণয়ের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি ভুল রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রোগ নির্ণয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

তবে প্রতিবেদনের বক্তব্য এই নয় যে বর্তমানে ব্যাপক হারে ভুল রোগ নির্ণয় হচ্ছে। বরং চাহিদা ও নির্ণয়ের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার কারণে সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একই ধরনের লক্ষণ বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই ব্যক্তির বিকাশ, পারিবারিক ও শিক্ষাগত পরিস্থিতি এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা জরুরি। ভুল মূল্যায়নে প্রকৃত সমস্যার সমাধান পিছিয়ে যেতে পারে; আবার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও রোগ নির্ণয় না হলে ব্যক্তির সহায়তা পাওয়াও ব্যাহত হতে পারে।

সরকার কী পরিবর্তন আনতে পারে?

পর্যালোচনার সুপারিশ অনুযায়ী, শুধু অপেক্ষার তালিকায় কে আগে নাম লিখিয়েছেন, তার ভিত্তিতে নয়—কার প্রয়োজন সবচেয়ে জরুরি, সেটি বিবেচনা করে রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। আত্মক্ষতির ঝুঁকি, একাধিক জটিলতা, স্কুল থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা কিংবা কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য ও স্নায়ুবিকাশজনিত সেবার মধ্যে সমন্বয়, স্কুল ও স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সহায়তা এবং আনুষ্ঠানিক রোগ নির্ণয়ের আগেই প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার জানিয়েছেন, সরকার প্রয়োজনভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে যেতে চায় এবং এনএইচএসকে দ্রুত পরামর্শ, মূল্যায়ন ও চিকিৎসা দেওয়ার উপায় নির্ধারণ করতে বলেছে। বেসরকারি মূল্যায়নকেন্দ্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। তবে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার সুপারিশ সরকার গ্রহণ করেছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। 

সামনে বড় পরীক্ষা এনএইচএসের

সরকারি পর্যালোচনা স্পষ্ট করেছে, এডিএইচডি ও অটিজম সেবার সংকট কেবল অপেক্ষার তালিকা ছোট করার বিষয় নয়। প্রয়োজনীয় সহায়তা কখন, কোথায় এবং কীভাবে দেওয়া হবে—সেই ব্যবস্থারও পরিবর্তন দরকার।

সংস্কারের লক্ষ্য যদি হয় মানুষকে শুধু রোগ নির্ণয়ের জন্য অপেক্ষা করানো নয়, বরং বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সহায়তা দেওয়া, তাহলে শিশু, পরিবার, স্কুল ও কর্মক্ষেত্র—সব জায়গাতেই ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং কার্যকর সেবা কাঠামো নিশ্চিত না হলে অপেক্ষার সংকট কাটানো কঠিন হবে।

এখন দেখার বিষয়, সরকার পর্যালোচনার সুপারিশগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করে এবং দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা মানুষদের জন্য কত দ্রুত কার্যকর সহায়তার ব্যবস্থা করতে পারে।