তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

বাজেট নিয়ে চাপে লেবার সরকার, ভোটারদের জীবনযাত্রার উন্নতি না হলে বিপদের আশঙ্কা

বাজেট নিয়ে চাপে লেবার সরকার, ভোটারদের জীবনযাত্রার উন্নতি না হলে বিপদের আশঙ্কা

লন্ডন, ১০ অক্টোবর : নির্বাচনের আগে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল লেবার পার্টি। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর অর্থনৈতিক চাপ, বাড়তে থাকা জ্বালানি ব্যয় এবং সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলছে। আগামী ২৮ অক্টোবরের বাজেট তাই শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, লেবার সরকারের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

দলটির অভ্যন্তরীণ মহলে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ ভোটাররা আর শুধু আশ্বাস শুনতে চাইছেন না। তাঁরা দেখতে চান, মাস শেষে সংসারের খরচ মেটানোর পর হাতে কত টাকা থাকছে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল কতটা কমছে, বাড়িভাড়া ও বন্ধকী ঋণের চাপ সামলানো কতটা সহজ হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি না হলে আগামী নির্বাচনে লেবার পার্টিকে কঠিন মূল্য দিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দলটির কয়েকজন নেতা।

৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, লেবারের অভ্যন্তরে বাজেট নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো মানুষের প্রত্যাশা এবং সরকারের বাস্তব আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে ব্যবধান। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করলেও কেবল ছোটখাটো সমস্যার সমাধান দিয়ে ভোটারদের সন্তুষ্ট করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

মানুষের পকেটে টান, বাড়ছে সরকারের ওপর চাপ

ব্রিটেনের সাধারণ পরিবারের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। খাবার, জ্বালানি, বিদ্যুৎ-গ্যাস, বাড়িভাড়া এবং যাতায়াতের খরচ সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় ব্যয়ও কমাতে হচ্ছে।

জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ৫ থেকে ৩০ আগস্টের মধ্যে জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক জানিয়েছেন, আগের মাসের তুলনায় তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। যাঁরা ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলেছেন, তাঁদের ৯৪ শতাংশ খাদ্যপণ্যের দাম, ৭২ শতাংশ জ্বালানির দাম এবং ৬৪ শতাংশ গ্যাস বা বিদ্যুতের বিলকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

একই জরিপে জীবনযাত্রার ব্যয়কে দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ৮৯ শতাংশ উত্তরদাতা। স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনীতিও মানুষের উদ্বেগের তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছে।

এই পরিসংখ্যান সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান ভালো হলেই সাধারণ মানুষ সরকারের সাফল্য অনুভব করেন না। তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমছে কি না এবং সংসার চালানোর ক্ষেত্রে আগের চেয়ে স্বস্তি ফিরছে কি না।

২৮ অক্টোবরের বাজেট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

অর্থমন্ত্রী জন হিলির প্রথম বাজেট ঘোষণার কথা রয়েছে ২৮ অক্টোবর। কিন্তু অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে তাঁর সামনে কঠিন হিসাব-নিকাশ অপেক্ষা করছে।

দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক ঋণবাজারে সুদের চাপ ব্রিটিশ সরকারের আর্থিক পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলেছে। সরকারের ঋণ নেওয়ার ব্যয় বেড়ে গেলে নতুন কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় সরকারকে একদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে, অন্যদিকে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর আস্থা ধরে রাখতে হবে। আয়কর, জাতীয় বিমা অবদান ও মূল্য সংযোজন কর বাড়ানোর বিষয়ে লেবারের আগের প্রতিশ্রুতিও সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে।

ফলে বাজেটে বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বদলে সীমিত পরিসরে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সহায়তা মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ কমানোর জন্য যথেষ্ট হবে কি না।

জ্বালানি বিলে ছাড়, কিন্তু কতটা স্বস্তি মিলবে?

বাজেট ঘিরে আলোচনার অন্যতম বিষয় হলো পরিবারগুলোর জ্বালানি ব্যয় কমানো। নিম্ন আয়ের পরিবারকে সহায়তা দিতে এক বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি ব্যয়ের একটি সম্ভাব্য কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

এ ছাড়া নির্দিষ্ট সুবিধাভোগী পরিবারগুলোর জন্য বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিলে দেওয়া ছাড় বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে এগুলোকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। বাজেটে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কত অর্থ বরাদ্দ করা হবে এবং কারা সুবিধা পাবেন, তা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরই নিশ্চিত হবে।

সরকারের জন্য সমস্যাটি হলো, সীমিত সহায়তা দিয়ে সাময়িক স্বস্তি দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, আয় বৃদ্ধি এবং আবাসনসংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

শুধু একটি বিলে ছাড় দিয়ে যদি বাড়িভাড়া, খাদ্যপণ্যের দাম এবং ঋণের কিস্তির চাপ অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে অনেক পরিবারের কাছে সেই সুবিধার প্রভাব সীমিত মনে হতে পারে।

জীবনযাত্রার মান নিয়ে বড় সতর্কবার্তা

বাজেটের আগে প্রকাশিত আরেকটি বিশ্লেষণ লেবার সরকারের জন্য উদ্বেগ বাড়িয়েছে। জোসেফ রাউনট্রি ফাউন্ডেশনের গবেষণার ভিত্তিতে ৭ অক্টোবর দ্য গার্ডিয়ান জানায়, জ্বালানি ও আবাসন ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকলে বর্তমান সংসদীয় মেয়াদে ব্রিটেনের জীবনযাত্রার মানের অবনতি সাম্প্রতিক ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হতে পারে।

এটি কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়; বরং বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য জ্বালানি ব্যয়ের ভিত্তিতে তৈরি সতর্কবার্তা। তবে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।

কারণ, লেবার পার্টির প্রতি ভোটারদের প্রত্যাশার একটি বড় অংশ ছিল দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্তি। সরকার যদি সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিরোধী দলগুলো মানুষের অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে।

কনজারভেটিভ পার্টি এবং রিফর্ম ইউকে ইতিমধ্যেই সরকারি ব্যয়, করনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ বাড়লে লেবারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করা আরও কঠিন হতে পারে।

ব্রিটিশ বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য কী অর্থ বহন করছে এই বাজেট?

ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য বাজেটের প্রভাব সরাসরি অনুভব করার মতো। লন্ডনসহ বিভিন্ন শহরে বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল, কাউন্সিল ট্যাক্স, যাতায়াত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় সংসারের বাজেটের বড় অংশ নিয়ে নেয়।

যাঁরা বাড়ি কেনার জন্য বন্ধকী ঋণ নিয়েছেন, তাঁদের জন্য সুদের হার ও মাসিক কিস্তি গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা ভাড়া বাড়িতে থাকেন, তাঁদের কাছে ভাড়ার চাপ কমানো এবং সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বাড়ানো বড় বিষয়। একই সঙ্গে শিশুদের দেখাশোনা, বয়স্ক পরিবারের সদস্যদের সহায়তা এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও অনেক পরিবারের আর্থিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

অন্যদিকে, ছোট ব্যবসায়ী ও স্বনিযুক্ত ব্যক্তিরা ব্যবসার খরচ, কর এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। মানুষের হাতে খরচ করার মতো অর্থ কম থাকলে রেস্তোরাঁ, দোকান, পরিবহন ও অন্যান্য সেবামূলক ব্যবসায়ও তার প্রভাব পড়তে পারে।

তাই বাজেটে শুধু সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঘোষণা নয়, সাধারণ পরিবার ও ছোট ব্যবসার বাস্তব পরিস্থিতি কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

লেবার সরকারের সামনে এখন দুটি পথ

সরকারের সামনে মূলত দুটি চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর আস্থা বজায় রেখে ব্যয় ও ঋণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যার সুফল সাধারণ মানুষ নিজের সংসারেই অনুভব করতে পারেন।

শুধু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ঘোষণা করলে চলবে না। কর্মসংস্থান, আয়, আবাসন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে হবে। একই সঙ্গে সহায়তা কর্মসূচির অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং তা কীভাবে সবচেয়ে প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাবে, সেটিও পরিষ্কার করতে হবে।

বাজেটে সীমিত সহায়তা দেওয়া হলে সরকার হয়তো আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার যুক্তি দেখাতে পারবে। কিন্তু ভোটারদের কাছে সেই যুক্তির গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে তাঁদের ব্যক্তিগত আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতির ওপর।

লেবার সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি এখানেই। মানুষ যদি মনে করেন, তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পূরণ হচ্ছে না, তাহলে সরকারের অন্যান্য সাফল্যও সেই অসন্তোষ ঢাকতে পারবে না।

২৮ অক্টোবরের বাজেট তাই শুধু অর্থমন্ত্রী জন হিলির আর্থিক পরিকল্পনার পরীক্ষা নয়; এটি অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। শেষ পর্যন্ত বাজেটের সাফল্য নির্ধারিত হবে ঘোষিত অর্থের পরিমাণ দিয়ে নয়, বরং সাধারণ মানুষ কতটা স্বস্তি পেলেন, তার ভিত্তিতে।