‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’
আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেলে রাখার সংখ্যা কমেছে, ব্রিটেনের অভিবাসননীতিতে কী পরিবর্তন?
লন্ডন, ১০ অক্টোবর: ব্রিটেনে আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেলে রাখার সংখ্যা এক বছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে। সরকারের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনের শেষে হোটেলে বসবাস করছিলেন ১৬ হাজার ২১ জন আশ্রয়প্রার্থী। এক বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৪১। আর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে হোটেলে রাখা হয়েছিল ৫৬ হাজার ১৮ জনকে। সরকারের দাবি, আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদনের সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া এবং বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা বাড়ানোর ফলে এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। তবে হোটেলের সংখ্যা কমলেও ব্রিটেনের আশ্রয়প্রক্রিয়ার সব সমস্যা সমাধান হয়নি। বরং আবাসন, আপিলের দীর্ঘসূত্রতা এবং অভিবাসননীতির কঠোরতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে।
হোটেলের সংখ্যা কমল কীভাবে?
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৭ আগস্ট প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের জুনের শেষে সরকারি সহায়তা পাওয়া মোট আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৯৩ হাজার ২৯৩। তাঁদের মধ্যে ১৬ হাজার ২১ জন হোটেলে, ৭৩ হাজার ৬৮ জন হোটেলের বাইরে অন্যান্য আবাসনে ছিলেন। আরও ৪ হাজার ২০৪ জন শুধু আর্থিক সহায়তা পাচ্ছিলেন।
অর্থাৎ হোটেলে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমলেও সরকারের সহায়তাধীন সবাই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, এমন নয়। তাঁদের একটি বড় অংশকে হোটেল থেকে সরিয়ে অন্য আবাসনে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্থায়ী আবাসন, বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া বাসস্থান এবং একাধিক ব্যক্তির বসবাসের উপযোগী ভাড়া করা বাড়ি।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, হোটেলের পরিবর্তে ব্যক্তিমালিকানাধীন ভাড়া বাড়িতে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে হোটেলে থাকা মানুষের সংখ্যা কমাকে পুরো আশ্রয়প্রার্থী জনগোষ্ঠীর সমপরিমাণ হ্রাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

আশ্রয় আবেদনের সিদ্ধান্ত দ্রুত হচ্ছে
হোটেলে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমার অন্যতম কারণ হলো, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগের তুলনায় বেশি আবেদনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত দিতে পারছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনের শেষে ৪০ হাজার ১৬৮ জন তাঁদের আশ্রয়ের আবেদনের প্রাথমিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন। এক বছর আগে এই সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় অপেক্ষমাণ মানুষের সংখ্যা ৫৬ শতাংশ কমেছে। ২০২৩ সালের জুনে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫৭ জনে।
সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং কাজের উৎপাদনশীলতা উন্নত করার ফলে আবেদন নিষ্পত্তির গতি বেড়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী আবাসনে থাকা কিছু মানুষের আবেদন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
তবে প্রাথমিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা কমে যাওয়া মানেই পুরো আইনি প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়া নয়। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে কেউ কেউ আপিল করতে পারেন। আবার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ থাকলে তাঁদের অবস্থান ও আবাসনসংক্রান্ত বিষয়ও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার প্রবণতাও কমেছে
ব্রিটিশ সরকারের অভিবাসননীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো, ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা কমানো।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ কমেছে। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং ফরাসি পুলিশের বাধাদানের কথা উল্লেখ করেছেন।
তবে এই পরিসংখ্যান থেকে এককভাবে প্রমাণ হয় না যে সরকারের একটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপই নৌকায় আগমন কমিয়েছে। সীমান্তে নজরদারি, পাচারকারী চক্রের কার্যক্রম, আবহাওয়া এবং যাত্রাপথের অন্যান্য পরিস্থিতিও এ ধরনের সংখ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের সবাই ছোট নৌকায় আসেন না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে মোট ৮৫ হাজার ৮৯১ জন আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। তাঁদের প্রায় ৪১ শতাংশ যুক্তরাজ্যে আসার আগে ভিসা বা অন্য বৈধ অনুমতি পেয়েছিলেন। প্রায় ৪০ শতাংশ ছোট নৌকায় এসেছিলেন। বাকিরা বিভিন্ন পথ দিয়ে এসেছেন।
অভিবাসননীতিতে নতুন কী পরিবর্তন আসছে?
আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেলে রাখার সংখ্যা কমার পাশাপাশি সরকার অভিবাসন ও আশ্রয়ব্যবস্থায় আরও বিস্তৃত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে।
৮ অক্টোবর ব্রিটিশ সরকার নতুন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম বিল সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ করেছে। প্রস্তাবিত আইনের লক্ষ্য হলো অবৈধভাবে প্রবেশ কমানো, যাঁদের যুক্তরাজ্যে থাকার আইনি অধিকার নেই তাঁদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা জোরদার করা এবং আশ্রয়ের আবেদনের বিরুদ্ধে আপিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া দ্রুত করা।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- আপিলের জন্য নতুন কর্তৃপক্ষ: আশ্রয় ও অভিবাসনসংক্রান্ত আপিল দ্রুত এবং সুষ্ঠুভাবে নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনা।
- সরকারি সহায়তার ব্যয় ফেরত নেওয়া: আশ্রয়প্রার্থীরা ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে সক্ষম হলে তাঁদের আবাসন ও অন্যান্য সহায়তার ব্যয়ের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব।
- প্রত্যাবাসন জোরদার: যুক্তরাজ্যে থাকার অধিকার নেই—এমন ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুত করার উদ্যোগ।
- আইনি সুরক্ষার নিয়মে পরিবর্তন: মানবাধিকার আইনের কিছু বিধান কীভাবে অভিবাসন সিদ্ধান্তে প্রয়োগ করা হবে, তা স্পষ্ট করার পরিকল্পনা।
- আশ্রয় আবেদনের কাঠামো সহজ করা: শরণার্থী মর্যাদা ও মানবিক সুরক্ষার আবেদনসংক্রান্ত কিছু প্রক্রিয়াকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার প্রস্তাব।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলো নতুন বিলের প্রস্তাবিত ব্যবস্থা। বিলের সব বিধান ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে—এমন ধারণা করা যাবে না। আইন হিসেবে পাস হওয়া এবং কার্যকর হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিধানগুলোর আইনি অবস্থান ও বাস্তবায়নের সময়সূচি দেখতে হবে।
আশ্রয়প্রার্থীদের পেছনে কত খরচ হচ্ছে?
আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম কারণ সরকারি ব্যয়। সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তায় মোট ৪০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় হয়েছিল। এর মধ্যে শুধু হোটেলে আশ্রয়প্রার্থীদের রাখার জন্য দৈনিক ব্যয় ছিল প্রায় ৫৫ লাখ পাউন্ড।
হোটেলে থাকা মানুষের সংখ্যা কমে আসায় সরকারের ব্যয়ের ওপর চাপও কিছুটা কমেছে। তবে আশ্রয়প্রার্থীদের অন্য আবাসনে স্থানান্তর করতে হচ্ছে বলে মোট ব্যয় কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে বিকল্প বাসস্থানের খরচ, চুক্তি এবং ব্যবস্থাপনার ওপর।
সরকারের প্রস্তাবিত নতুন আইনে আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাঁদের পাওয়া সহায়তার ব্যয়ের একটি অংশ ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। সরকারের যুক্তি, যাঁরা ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবেন, তাঁদের কাছ থেকে যুক্তিসংগত অবদান নেওয়া সম্ভব হওয়া উচিত।
কিন্তু এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কার কাছ থেকে কত অর্থ নেওয়া হবে, কীভাবে সক্ষমতা নির্ধারণ করা হবে এবং কীভাবে নিশ্চিত করা হবে যে কাউকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে না—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে পরবর্তী আইন ও বিধিমালার ওপর।
হোটেল কমলেও আপিলের জট বাড়ছে
আশ্রয়ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি এখন আপিলের অপেক্ষা। প্রাথমিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা মানুষের সংখ্যা কমলেও পরবর্তী আইনি ধাপে মামলার চাপ বেড়েছে।
সরকারের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুনে আশ্রয় ও সুরক্ষাসংক্রান্ত আপিলের অপেক্ষমাণ মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার। ২০২৩ সালের জুনে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ হাজার। একই তথ্যপত্রে আপিলের সিদ্ধান্তের জন্য গড় অপেক্ষার সময় ৬৫ সপ্তাহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর অর্থ, আবেদনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত দ্রুত দেওয়া গেলেও আইনি আপিলের পর্যায়ে দীর্ঘসূত্রতা রয়ে গেছে। ফলে কিছু আবেদনকারীকে দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হতে পারে।
ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য অভিবাসননীতির পরিবর্তন নিয়ে সঠিক তথ্য জানা জরুরি। তবে আশ্রয়প্রার্থী, বৈধ ভিসাধারী, কর্মী, শিক্ষার্থী এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি—এরা সবাই একই আইনি শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নন।
আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনসংক্রান্ত সরকারি পরিসংখ্যানকে ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি মিলিয়ে দেখা ঠিক হবে না। একইভাবে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন নিয়ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ধরনের ভিসাধারী বা স্থায়ী বাসিন্দার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, এমন ধারণাও সঠিক নয়।
তবে অভিবাসন আইন, মানবাধিকার, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয় নিয়ে পরিবর্তনগুলো বৃহত্তর ব্রিটিশ রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা ভবিষ্যতে পরিবার নিয়ে আসা, ভিসা পরিবর্তন, স্থায়ী বসবাস কিংবা নাগরিকত্বের পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়মের সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
ব্রিটেনে আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেলে রাখার সংখ্যা কমা সরকারের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। কিন্তু এই সাফল্য কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে বিকল্প আবাসনের ব্যয়, আবেদন নিষ্পত্তির গতি, আপিলের জট এবং সীমান্ত দিয়ে আগমনের প্রবণতার ওপর।
একদিকে সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চাইছে। অন্যদিকে আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি অধিকার, নিরাপদ আবাসন এবং ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার দায়িত্বও রয়েছে।
তাই হোটেলে থাকা মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসাকে অভিবাসনসংকটের সম্পূর্ণ সমাধান বলা যাবে না। বরং এটি বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি অংশ। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সরকার কত দ্রুত ও ন্যায়সংগতভাবে আবেদন নিষ্পত্তি করতে পারে, বিকল্প আবাসন কতটা কার্যকর হয় এবং যাঁদের যুক্তরাজ্যে থাকার অধিকার নেই তাঁদের ক্ষেত্রে আইনসম্মত সিদ্ধান্ত কতটা দ্রুত কার্যকর করা যায়—তার ওপর।