“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬৩।। অহরহ দেশে চলছে মব: এটাই কি এখন মূল জব?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬৩।। অহরহ দেশে চলছে মব: এটাই কি এখন মূল জব?

উৎসর্গ

মব-সহিংসতায় নিহত ও নির্যাতিত সকল মানুষের স্মৃতির প্রতি এবং আইনের শাসনে নিরাপদ বাংলাদেশ প্রত্যাশী মানুষের উদ্দেশে।

বাংলাদেশে এখন কাউকে অপরাধী বানাতে আদালতের রায়ের প্রয়োজন হচ্ছে না। একটি অভিযোগ, একটি ফেসবুক পোস্ট কিংবা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গুজবই কখনো কখনো যথেষ্ট। মুহূর্তে জড়ো হচ্ছে মানুষ, শুরু হচ্ছে মারধর, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ—কখনো কেড়ে নেওয়া হচ্ছে প্রাণও। অপরাধের বিচার করার কথা রাষ্ট্রের; অথচ কোথাও কোথাও জনতাই যেন পুলিশ, জনতাই বিচারক, জনতাই জল্লাদ। প্রশ্ন হলো, আইনের শাসনের দেশে মবের এই দাপটই কি এখন আমাদের নতুন বাস্তবতা?

ইউনূস সরকারের সময় থেকে তারেক রহমানের সরকারের সময় পর্যন্ত দেশে মব-সহিংসতার নানা ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তোফাজ্জল হোসেন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শামীম আহমেদকে পিটিয়ে হত্যা, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যা, নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়া, মাজার ও সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা, শিক্ষক-সাংবাদিকদের হেনস্তা, জোর করে পদত্যাগ করানো এবং বিভিন্ন স্থানে হাসপাতাল ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর—সবই একই বিপজ্জনক প্রবণতার প্রকাশ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের শেষ দিন পর্যন্ত দেশের ৯৭টি মাজারে হামলার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনায় তিনজন নিহত ও ৪৬৮ জন আহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। সরকার বদলালেও মব-সহিংসতা না থামা প্রমাণ করে, এটি এখন আর কোনো একক সময় বা গোষ্ঠীর সমস্যা নয়; আইনের শাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

মবের পেছনে সব সময় একই উদ্দেশ্য কাজ করে না। কখনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কখনো ধর্মীয় উসকানি, কখনো জমি বা ব্যবসার বিরোধ, কখনো ব্যক্তিগত শত্রুতা—আবার কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব মানুষকে সংঘবদ্ধ করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের দাবি সামনে রাখা হলেও আড়ালে থাকে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করা, ভিন্নমত দমন কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা। অপরাধের অভিযোগ সত্য হলেও কাউকে পিটিয়ে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। অভিযোগ মিথ্যা হলে ক্ষতিটা আরও ভয়াবহ। আর জনতার হাতে বিচার চলতে থাকলে আজকের অভিযুক্তের জায়গায় কাল যে কেউ দাঁড়াতে পারেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মবের কাছে মানুষের পরিচয় ও অধিকার ক্রমশ গৌণ হয়ে পড়ছে। কারও ধর্মীয় বিশ্বাস ভিন্ন, কেউ বিশেষ মতাদর্শের অনুসারী, কেউ রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয়, কেউ কেবল সন্দেহের শিকার—তাঁর নিরাপত্তা কি আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। কিন্তু অভিযোগের অজুহাতে মাজার ভাঙা, উপাসনালয়ে হামলা, কাউকে পিটিয়ে হত্যা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই ধর্মরক্ষা বা সমাজরক্ষার পথ হতে পারে না। এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের আইনি কর্তৃত্ব—দুটোকেই দুর্বল করে।

মব ঠেকাতে রাষ্ট্র ও সমাজকে যা করতে হবে

প্রথমত, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধকেই বিবেচনা করতে হবে। মব-সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তি যে দলেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের লোক হলে ছাড়, বিরোধী দলের লোক হলে কঠোরতা—এমন দ্বৈতনীতি চলতে থাকলে মানুষ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারাবে। শুধু মামলা করলেই হবে না; তদন্ত, গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র ও বিচার—প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি দৃশ্যমান করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পুলিশকে ঘটনার পর নয়, ঘটনার আগেই সক্রিয় হতে হবে। কোনো এলাকায় উত্তেজনা ছড়ানোর খবর পাওয়া গেলে হামলা শুরু হওয়ার অপেক্ষা করা যাবে না। গুজব, উসকানি কিংবা সংঘবদ্ধ হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সম্ভাব্য আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া, হামলাকারীদের শনাক্ত করা এবং ডিজিটাল ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ সংরক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি যেন কেবল ক্ষয়ক্ষতির পর দেখা না যায়।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের কর্মীদের ব্যাপারে আপসহীন হতে হবে। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে হামলা, দখল, চাঁদাবাজি, হুমকি কিংবা জোর করে পদত্যাগ করানোর মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। নেতাদের মুখে সহিংসতার নিন্দা আর মাঠে কর্মীদের দায়মুক্তি—এই দ্বিচারিতা বন্ধ না হলে মব-সংস্কৃতি রাজনৈতিক প্রশ্রয় পেতেই থাকবে।

চতুর্থত, বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। মামলা করেও বিচার পাওয়া যায় না—এমন ধারণা যত বাড়বে, ততই কেউ কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অজুহাত খুঁজবে। তাই তদন্তের মান বাড়ানো, সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গুরুতর সহিংসতার মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তবে বিচার পেতে দেরি হওয়া কখনোই গণপিটুনি বা হত্যার বৈধতা দিতে পারে না।

পঞ্চমত, গুজব ও অনলাইন উসকানি ঠেকাতে হবে, কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করে নয়। কোনো পোস্ট, ছবি বা ভিডিও দেখে উত্তেজিত হওয়ার আগে তথ্য যাচাই করতে হবে। কর্তৃপক্ষকে দ্রুত নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সহিংসতায় উসকানি দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু সরকারের সমালোচনা, ভিন্নমত কিংবা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে অপরাধ বানানো যাবে না।

ষষ্ঠত, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের প্রকাশ্যে দায়িত্ব নিতে হবে। ধর্মের নামে সহিংসতা বন্ধে তাঁদের স্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তদন্তের বিষয়; শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আদালতের। একইভাবে রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদেরও বলতে হবে—মতের পার্থক্য থাকলেও কারও ওপর হামলার অধিকার কারও নেই।

সপ্তমত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহনশীলতার শিক্ষা দিতে হবে। ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মত কিংবা জীবনযাপনকে শত্রুতা হিসেবে দেখার প্রবণতা কমাতে হবে। শিশু-কিশোরদের শেখাতে হবে, গুজবের ভিত্তিতে কাউকে অপমান করা বা আক্রমণ করা অন্যায়। মতের অমিলের জবাব যুক্তি দিয়ে দিতে হয়, লাঠি দিয়ে নয়।

অষ্টমত, সংবাদমাধ্যমকে যাচাই করা তথ্য প্রকাশ করতে হবে। উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম, যাচাইহীন অভিযোগ কিংবা সহিংসতার ভিডিও বারবার প্রচার পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করতে পারে। সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো ঘটনার সত্যতা যাচাই, ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্য তুলে ধরা এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে মবের শিকার ব্যক্তির মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।

নবমত, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারকে নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দিতে হবে। মবের শিকার ব্যক্তিকে মামলা করার পর আবার হুমকির মুখে ফেলে রাখা চলবে না। নিহতের পরিবারকে সহায়তা, আহতদের চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ এবং ঝুঁকিতে থাকা ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

দশমত, প্রতিটি ঘটনার জবাবদিহি প্রকাশ্যে আনতে হবে। কতটি মামলা হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, তদন্ত কত দূর এগিয়েছে, কতটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং কতজনের বিচার হয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। এতে জনগণ বুঝতে পারবে, রাষ্ট্র কেবল নিন্দা জানাচ্ছে না; অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতেও কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

মব-সহিংসতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের সমষ্টি নয়; এটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সমাজের বিবেকের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। ইউনূস সরকারের সময় যে প্রবণতা ভয়াবহভাবে সামনে এসেছে, তারেক রহমানের সরকারের আমলেও তা চলতে থাকলে ক্ষমতার পালাবদল আর রাষ্ট্রের পরিবর্তনের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য থাকবে না। কারণ সরকার বদলানো মানেই শাসনব্যবস্থা বদলানো নয়; প্রকৃত পরিবর্তন তখনই আসে, যখন অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় উপেক্ষা করে আইন প্রয়োগ করা হয় এবং ভিন্নমতাবলম্বী, সংখ্যালঘু কিংবা সাধারণ নাগরিক—সবার নিরাপত্তা সমানভাবে নিশ্চিত করা হয়।

সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, মব যখন বারবার পার পেয়ে যায়, তখন সহিংসতা শুধু অপরাধীদের সাহস বাড়ায় না, সাধারণ মানুষের মনেও আইনের প্রতি অনাস্থা তৈরি করে। মানুষ তখন আদালতের বদলে জনতার শক্তিকে, প্রমাণের বদলে গুজবকে, আর ন্যায়বিচারের বদলে প্রতিশোধকে বিশ্বাস করতে শুরু করে। এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্রের আইন থাকবে কাগজে, কিন্তু বাস্তবের কর্তৃত্ব চলে যাবে সংঘবদ্ধ জনতার হাতে।

এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মবের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেওয়া সহজ; কঠিন হলো নিজের সমর্থক, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক মিত্র অপরাধে জড়ালেও নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নেওয়া। সেই সাহস না থাকলে আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি নিছক রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে সমাজকেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে—গুজব শুনে কাউকে অপরাধী বানাবে, নাকি প্রমাণ ও বিচারের জন্য অপেক্ষা করবে।

রাষ্ট্রের কাজ জনতার ক্ষোভকে বিচারক বানানো নয়, আইনকে কার্যকর করা। আদালতের কাজ বিচার করা, আর জনগণের কাজ অন্যায়ের প্রতিবাদ করা—কাউকে পিটিয়ে শাস্তি দেওয়া নয়। যে দেশে অভিযোগই দণ্ড, জনতাই বিচারক আর সহিংসতাই রায়, সে দেশে শেষ পর্যন্ত কেউ নিরাপদ থাকে না। তারেক রহমানের সরকারের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু মব থামানোর নয়; প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে, নাকি সংঘবদ্ধ শক্তির কাছে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে নেবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্যিকারের রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনে রূপ নেবে, নাকি ক্ষমতার মুখ বদলালেও মানুষের নিরাপত্তাহীনতা একই থেকে যাবে।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন,  ১০ অক্টোবর, ২০২৬