তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
পাগলা মসজিদে ছয় বছরে দান ১২ কেজি স্বর্ণ, প্রায় ১৩ কেজি রুপা
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৩ অক্টোবর : কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদে গত ছয় বছরে দানবাক্সে জমা পড়েছে ১২ কেজি ১৭৪ গ্রাম স্বর্ণ এবং ১২ কেজি ৬৯০ গ্রাম রুপা। সোমবার, ১২ অক্টোবর, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। মসজিদটির তহবিলে বর্তমানে জমা রয়েছে ১৩১ কোটি ৪১ লাখ ৪৪ হাজার ৮১০ টাকা।
পাগলা মসজিদে প্রতি তিন মাস পরপর দানবাক্স খোলা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এখানে দান ও মানত করতে আসেন। নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণালংকার, রুপা ও বিভিন্ন দেশের মুদ্রাও পাওয়া যায় দানবাক্সে।
জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মসজিদের নিজস্ব ওয়েবসাইট চালুর পর থেকে অনলাইনে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আরও ৩৯ লাখ ৩২ হাজার ১০৬ টাকা অনুদান এসেছে।
সোমবার সকাল পৌনে ১০টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে দানবাক্সে পাওয়া স্বর্ণ, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ নির্ধারণ এবং গণনার কার্যক্রম শুরু হয়। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদের নেতৃত্বে নয় সদস্যের উপকমিটির তত্ত্বাবধানে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, আনসার, ব্যাংক কর্মকর্তা ও স্বর্ণকারেরা এতে সহযোগিতা করছেন।
এর আগে ২০২০ সালের ১১ মার্চ নিলামে ৪১৫ ভরি এক আনা স্বর্ণ এবং ১৬৪ ভরি রুপা বিক্রি করে ১ কোটি ১৫ লাখ ৪ হাজার ১০০ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা নগদায়ন করে পাওয়া যায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৫১ টাকা।
পাগলা মসজিদে দানের এই বিপুল পরিমাণ মানুষের ধর্মীয় আবেগ, বিশ্বাস ও উদারতার পরিচয় দেয়। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সংগৃহীত বিপুল সম্পদ কীভাবে মানুষের কল্যাণে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা, অসহায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, এতিমদের সহায়তা এবং বিপদগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো কাজে দানের অর্থ ব্যবহৃত হলে এর সামাজিক সুফল আরও বিস্তৃত হতে পারে।

উল্লেখ্য যে, ইসলামে দান, মানত ও একত্ববাদের প্রশ্নে দানের উদ্দেশ্য এবং ধর্মীয় তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-জিনের ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মসজিদগুলো আল্লাহর জন্য; সুতরাং আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডাকা যাবে না। সুরা আল-ফাতিহার ৫ নম্বর আয়াতেও ইবাদত ও সাহায্য প্রার্থনা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া যাদের ডাকা হয়, তারা কিয়ামত পর্যন্ত কারও ডাকে সাড়া দিতে পারে না। (সুরা ফাতির, আয়াত ১৪)।
সহিহ মুসলিমের ১৯৭৮ নম্বর হাদিসে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদ্দেশে পশু কোরবানি দেওয়ার কঠোর নিন্দা করা হয়েছে। এসব নির্দেশনা থেকে স্পষ্ট, ইবাদত ও ধর্মীয় উৎসর্গের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা।
অতএব, কোনো মৃত ব্যক্তির কাছে সন্তান লাভ, রোগমুক্তি, বিপদ থেকে উদ্ধার বা মনোবাসনা পূরণের প্রার্থনা করা ইসলামের তাওহিদের শিক্ষার পরিপন্থী। মৃত ব্যক্তির অলৌকিক ক্ষমতার বিশ্বাসে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন বা তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়ার উদ্দেশ্যে দান করা বৈধ নয়। দানের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও বিশ্বাসের ওপরই বিধান নির্ভর করে।
তবে মসজিদের নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা দরিদ্র মানুষের কল্যাণে দান করাকে নিজে থেকেই শিরক বলা সঠিক নয়। প্রশ্নটি হলো—দানটি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, নাকি কোনো মৃত ব্যক্তি বা মাজারের কাছে অতিপ্রাকৃত সাহায্য পাওয়ার আশায় ধর্মীয় উৎসর্গ করা হচ্ছে? এ দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
পাগলা মসজিদে দানকারীদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া তাঁদের কাজকে শিরক বলে ঘোষণা করাও যথাযথ হবে না। বরং কোরআন-হাদিসের আলোকে দানের উদ্দেশ্য, মানতের প্রকৃতি এবং সংগৃহীত সম্পদের জনকল্যাণমূলক ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করাই অধিক যুক্তিসংগত।