তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রস্তাব বাতিলের ঝুঁকি বাড়ছে

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রস্তাব বাতিলের ঝুঁকি বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৩ অক্টোবর :

যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভিসার নিয়ম কঠোর হওয়ায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রস্তাব বাতিল বা স্থগিত করছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়। ভিসা প্রত্যাখ্যানের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমতি হারানোর ঝুঁকি এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে।

ফাইন্যানশিয়াল টাইমসের ১০ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, যেসব শিক্ষার্থীর ভিসা পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মনে করছে, তাদের ক্ষেত্রে ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহারের প্রবণতা বেড়েছে। এতে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন প্রত্যাহার বা বাতিলের হার বেড়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।

দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আবেদন প্রত্যাহার বা বাতিলের হার ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের একই সময়ে ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে হার ৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তা ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। নাইজেরীয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে হার বেড়ে ২২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

ভিসা প্রত্যাখ্যানের সীমা কমেছে

যুক্তরাজ্য সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষার্থী স্পনসর প্রতিষ্ঠানের ভিসা প্রত্যাখ্যানের গ্রহণযোগ্য হার ১০ শতাংশের কম থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশের কম করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও কোর্স সম্পন্ন করার হার নিয়েও শর্ত রয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠানের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নির্ধারিত সীমায় পৌঁছালে সেটি নিয়ম মেনে চলার মূল্যায়নে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে পড়তে পারে। পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির বিদেশি শিক্ষার্থী স্পনসর করার লাইসেন্স বাতিলের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। তবে পাঁচ শতাংশের সীমা অতিক্রম করলেই সব ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাইসেন্স বাতিল হয়—বিষয়টি এমন নয়; সরকারি নির্দেশিকায় মূল্যায়ন ও প্রযোজ্য ব্যবস্থার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।

এ কারণে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এমন আবেদনকারীদের ভর্তি প্রস্তাব আগেভাগে প্রত্যাহার করছে, যাদের ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা তারা করছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিয়োগের সিদ্ধান্তে ভিসার সম্ভাব্য ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

পাকিস্তানি শিক্ষার্থী ভর্তিতে স্থগিতাদেশ

ফাইন্যানশিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উচ্চশিক্ষা খাতের সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্যের প্রায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তান থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ স্থগিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রবণতা অন্য দেশ থেকেও শিক্ষার্থী নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সতর্কতা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থান হলো, শিক্ষার্থী ভিসার অপব্যবহার এবং অভিবাসনব্যবস্থার অনিয়ম ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা প্রয়োজন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্বেগ, কঠোর নিয়মের কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে গেলে তাদের আয়, কোর্স পরিচালনা এবং কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের করণীয়

যুক্তরাজ্যে পড়তে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি প্রস্তাব পাওয়ার পরও ভিসা নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি শর্ত, কোর্সের তথ্য, অর্থায়নের প্রমাণ এবং ভিসা আবেদনের প্রয়োজনীয় নথি যথাযথভাবে প্রস্তুত করা জরুরি। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার বা ভিসা স্পনসরশিপ নিয়ে প্রশ্ন তুললে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা নেওয়া উচিত।

তবে দেশভিত্তিক আবেদন প্রত্যাহার বা বাতিলের পরিসংখ্যানকে সব আবেদনকারীর ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার হিসেবে দেখা যাবে না। আবেদন প্রত্যাহার, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ভিসা প্রত্যাখ্যান—এগুলো এক বিষয় নয়। তাই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি মূল্যায়নে এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।