সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর এর ধারাবাহিক কলাম

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮৯।।  শবে কদর—একটি নির্দিষ্ট রাত, নাকি অনুসন্ধানের আহ্বান?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮৯।।  শবে কদর—একটি নির্দিষ্ট রাত, নাকি অনুসন্ধানের আহ্বান?

উৎসর্গ

“এই কলামটি উৎসর্গ করা হলো মুসলিম উম্মাকে—যাঁরা পরস্পরের জন্য দোয়া করেন এবং পুরো মুসলিম উম্মাকে এক দেহের মতো ভালোবাসেন”

রমজান মাস এলেই মুসলিম সমাজে একটি ব্যাপার প্রায় স্বতঃসিদ্ধভাবে ধরে নেওয়া হয়—২৬ রমজান দিবাগত রাতই শবে কদর। বহু মানুষ এ রাতে বিশেষ ইবাদত করেন, মসজিদগুলোতে বাড়তি আয়োজন হয়, আর অনেকেই মনে করেন এই একটি রাতেই কদরের সব রহমত নিহিত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—আসলেই কি শবে কদর একটি নির্দিষ্ট রাত, নাকি এটি এমন একটি রাত, যেটি খুঁজে বের করার জন্যই মুসলমানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে? কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে আমরা ভিন্ন একটি বাস্তবতা দেখতে পাই।

প্রথমেই কোরআনের দিকে তাকানো যাক।
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-কদরে বলা হয়েছে:

“নিশ্চয়ই আমি একে (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি লাইলাতুল কদরে। আর আপনি কী জানেন লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।”
(সূরা আল-কদর ৯৭:১–৩)

এই আয়াতে শবে কদরের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ কোরআন আমাদের রাতটির গুরুত্ব জানালেও সেটিকে নির্দিষ্ট দিন দিয়ে সীমাবদ্ধ করেনি।

এবার হাদিসের দিকে আসা যাক। সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) শবে কদরকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন।

হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।”
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ২০১৭; সহিহ মুসলিম)

এই হাদিসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে অনুসন্ধান করতে, অর্থাৎ এটি কোনো স্থির রাত নয়—বরং এমন একটি রাত, যা শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে হতে পারে।

আরেকটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

যে ব্যক্তি ঈমান সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করবে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ১৯০১)

এই হাদিসে রাতটির গুরুত্ব বলা হয়েছে, কিন্তু এখানেও নির্দিষ্ট তারিখ বলা হয়নি।

এখন প্রশ্ন আসে—তাহলে ২৬ রমজান দিবাগত রাতকে কেন অনেকেই শবে কদর ধরে নেন?

এর একটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা রয়েছে। কিছু সাহাবির বর্ণনায় ২৭তম রাতকে সম্ভাব্য শবে কদর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.) এক বর্ণনায় ২৭তম রাতের দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন (সহিহ মুসলিম)। এই বর্ণনা থেকেই অনেক অঞ্চলে ২৭তম রাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়।

তবে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও আলেমের মতে, শবে কদর কেবল একটি নির্দিষ্ট রাতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন বেজোড় রাতে হতে পারে—২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯ রমজানের রাতগুলোর মধ্যে।

ইমাম নববী (রহ.) সহ বহু ইসলামী পণ্ডিত বলেছেন যে, শবে কদরকে গোপন রাখা হয়েছে মুসলমানদের বেশি ইবাদতের উৎসাহ দেওয়ার জন্য। যদি রাতটি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো, তাহলে অনেকেই শুধু সেই রাতেই ইবাদত করত, অন্য রাতগুলো উপেক্ষিত হয়ে যেত।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে আমরা এ বিষয়টির বাস্তব প্রয়োগ দেখতে পাই। সহিহ হাদিসে এসেছে যে, রমজানের শেষ দশকে তিনি ইতিকাফ করতেন এবং রাতগুলোতে বেশি ইবাদত করতেন

হযরত আয়েশা (রা.) বলেন:

রমজানের শেষ দশক শুরু হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) রাত জেগে ইবাদত করতেন, পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং ইবাদতে বেশি মনোযোগ দিতেন।”
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ২০২৪; সহিহ মুসলিম)

এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই শেষ দশকের বহু রাতকে গুরুত্ব দিতেন—শুধু একটি রাতকে নয়।

এখানেই আমাদের সমাজের একটি বাস্তব সমস্যা চোখে পড়ে। অনেকেই পুরো রমজান তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিকভাবে কাটান, কিন্তু ২৬ রমজান দিবাগত রাতকে কেন্দ্র করে হঠাৎ এক রাতের জন্য ইবাদতের জোয়ার তৈরি হয়। অথচ হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, শেষ দশকের একাধিক রাতেই ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া উচিত।

অতএব কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কার—
শবে কদর একটি মহিমান্বিত রাত, কিন্তু এটি নির্দিষ্ট করে ২৬ বা ২৭ রমজানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে এটি অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে। সেটা বেজোড় ছাড়াও কোন কোন বছর জোড় রাতেও হতে পারে। কারণ পৃথিবী তো ক্রমাগত ঘুরছে। সুতরাং কালের চক্রে কোন দিন কোন রাতে শবে ক্বদর হবে সেটা আল্লাহই ভাল জানেন। তবে জোড় ও বেজোড় মিলিয়ে রমজানের শেষ দশদিন রাতে এবাদত করলে অবশ্যই এর মধ্যে একদিন শবে ক্বদর থাকবেই।

এই উপলব্ধি থাকলে আমাদের ইবাদতের ধরনেও পরিবর্তন আনতে পারে। একটি নির্দিষ্ট রাতের উপর নির্ভর না করে, যদি আমরা শেষ দশকের প্রতিটি বেজোড় রাতে আন্তরিকভাবে ইবাদত করি, তাহলে শবে কদরের বরকত লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি হয়ে যায়।

রমজানের শিক্ষা এখানেই—
ইবাদতকে কোনো এক রাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, ধারাবাহিকতা আন্তরিকতার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও অধ্যাপক

লন্ডন, ১৫ মার্চ ২০২৬