সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর এর ধারাবাহিক কলাম

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯০ ।। সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি : একজন বঙ্গবন্ধু

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯০ ।।  সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি : একজন বঙ্গবন্ধু

উৎসর্গ

বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতি—
“যার প্রাণকেন্দ্রে চিরকাল জাগ্রত থাকবেন বঙ্গবন্ধু”

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০–১৯৭৫) কেবল স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিই নন, তিনি এদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য পৃষ্ঠপোষক ও প্রেরণার উৎস। তাঁর জীবন, চিন্তা, ভাষণ, লেখনী ও কর্মধারায় সমৃদ্ধ হয়েছে বাঙালির সাংস্কৃতিক জগৎ। একইসঙ্গে তাঁর জীবন ও আদর্শকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশে রচিত হয়েছে অসংখ্য বই, প্রবন্ধ, নাটক, গান ও চলচ্চিত্র।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার সংস্কৃতি।” আবার তিনি বিশ্বাস করতেন, “ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির সমৃদ্ধি ছাড়া কোনো জাতির উন্নতি সম্ভব নয়।” এ থেকেই স্পষ্ট, তাঁর রাজনীতি ছিল সংস্কৃতিনির্ভর।

তাঁর সাংস্কৃতিক মনন সম্পর্কে জানা যায় তাঁর নিজের রচনা—‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘আমার দেখা নয়াচীন’, ‘কারাগারের রোজনামচা’—এবং সমকালীন স্মৃতিচারণ ও পত্রপত্রিকা থেকে। ১৯৭১ সালে নিউজউইক তাঁকে বলেছিল “রাজনীতির কবি”; আর শেখ হাসিনা আখ্যা দিয়েছেন “রাজনীতির নান্দনিক শিল্পী” হিসেবে।

শৈশব থেকেই গান, খেলাধুলা ও ব্রতচারীর মাধ্যমে তাঁর সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। পরিবারে নিয়মিত পত্রিকা পাঠ এবং পরবর্তীতে কারাজীবনে বইয়ের সান্নিধ্য তাঁর মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি নিজেই লিখেছেন, “বই আর কাগজই আমার বন্ধু।” কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-সাংবাদিকদের সান্নিধ্য বঙ্গবন্ধু খব পছন্দ করতেন। জসীমউদদীন, জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, শাহাবুদ্দিন, নীলিমা ইব্রাহীম, মাজহারুল ইসলাম, মানিক মিয়া, এবিএম মূসা, আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রমুখ তাঁর ঘনিষ্ঠ সুহৃদ ছিলেন। 

সংবাদপত্রের সঙ্গেও তিনি গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন—‘ইত্তেফাক’, ‘মিল্লাত’, ‘নতুন দিগন্ত’, ‘বাংলার বাণী’-তে লিখেছেন। তাঁর নিজের লেখাগুলো আজ ইতিহাসের অমূল্য দলিল। পাঠ ও জ্ঞানচর্চাকে তিনি রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতেন।

১৯৪৮–৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে অনন্য অবদান রাখে। ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকেই বাঙালির জাতীয় পরিচয় সুদৃঢ় হয় এবং স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর সাহিত্য ও সঙ্গীতপ্রেম ছিল গভীর। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলালের গান ও কবিতা ছিল তাঁর প্রিয়। তিনি ‘আমার সোনার বাংলা’কে জাতীয় সংগীত এবং নজরুলের ‘চল চল চল’কে রণসংগীতের মর্যাদা দেন। ১৯৭২ সালে কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে এনে নাগরিকত্ব প্রদান তাঁর সাংস্কৃতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ।

লোকসংগীত—ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, জারি-সারি—তাঁর প্রিয় ছিল। আব্বাসউদ্দিন, রমেশ শীল, শাহ আবদুল করিমসহ বহু শিল্পীর গান তিনি উপভোগ করতেন। চলচ্চিত্রের প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল; ১৯৫৭ সালে প্রাদেশিক মন্ত্রী থাকা অবস্থায় চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফডিসি) প্রতিষ্ঠা তাঁর দূরদর্শী পদক্ষেপ।

বঙ্গবন্ধু চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘সংগ্রাম’ নামক একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে তাঁর নিজের পরিচয় অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট হিসাবে এবং জাপানি পরিচালক নাগিসা ওশিমার ‘রহমান : ফাদার অব বেঙ্গল’ প্রামাণ্যচিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তাঁর আমলে (১৯৭১-১৯৭৫) বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও সাহিত্যভিত্তিক অনেক কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। ‘সংগ্রাম’ মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি।কোনো চলচ্চিত্রের জন্য বঙ্গবন্ধুর অভিনয়ের ঘটনা সম্ভবত এই একটিই।

পরিচালক চাষী নজরুল জীবতকালে এ নিয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধু ভীষণ স্নেহ করতেন মুক্তিযোদ্ধা ও পরে অভিনেতা কামরুল হাসান খসরুকে। সেই সুযোগই পরিচালক চাষী  অভিনেতা খসরু বঙ্গবন্ধুকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় খসরু পরবর্তীতে আব্দুল মান্নানের সাহায্য নেন, যিনি তাকে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে রাজি করেন। একরকম জোর করেই রাজি করান নেতাকে সিনেমায় অভিনয় করাতে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পিলখানায় শুটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। সেদিন বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি অনুষ্ঠান ছিল। প্রধান অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ঠিক হয়, তার আগেই করা হবে শুটিং।

সে অনুযায়ী নেওয়া হয় সব প্রস্তুতি। মাঠে প্রস্তুত সুসজ্জিত সেনাদল। একদম সামনের সারিতে খসরু। আর মঞ্চে সবার সামনে বঙ্গবন্ধু। পেছনে সারি বেঁধে সেনাবাহিনীর সব শীর্ষ কর্মকর্তা- কে এম সফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ, জিয়াউর রহমান প্রমুখ। মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে কয়েক দফা কুচকাওয়াজ চলে। সুসজ্জিত সেনাদলের সঙ্গে পা মেলান খসরুও। পরিচালকের কথামতো স্যালুট নেওয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়ান বঙ্গবন্ধু।

বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে নেওয়া হচ্ছে শট। একসময় অধৈর্য হয়ে পরিচালক চাষীকে স্নেহের ধমক দেন বঙ্গবন্ধু, ‘এই, কতক্ষণ হাত তুইলা রাখব রে।’ চাষী নজরুল কাঁচুমাচু মুখে বললেন, ‘আর অল্প কিছুক্ষণ।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আরে কী করস না করস তোরা।’ কিন্তু ঠিকই শুটিং শেষ করেন প্রায় মিনিট দশেক স্যালুট নেওয়ার ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থেকে।’’

সংগ্রাম চলচ্চিত্রে অভিনয়ের দৃশ্য

নাট্যচর্চার প্রসারেও বঙ্গবন্ধু ভূমিকা রাখেন। ১৮৭৬ সালের অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের মাধ্যমে নাটকের স্বাধীন বিকাশের পথ সুগম করেন। স্বাধীনতার পর নাট্য আন্দোলন নতুন গতি পায়।

বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’ (১৯৭৪), সোনারগাঁয়ের ‘বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন’, (১৯৭৫), নেত্রকোনার ‘উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি’, রাঙামাটির ‘উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট’, ‘বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র’ প্রভৃতি। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর আমলে চুক্তি সম্পাদিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম ও আদর্শ নিজেই এক বিশাল সাংস্কৃতিক ভাণ্ডার। তাঁকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য সাহিত্যকর্ম, শিল্পকলা ও চলচ্চিত্র। তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক নন—তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের উজ্জ্বল প্রতীক, এক অম্লান নক্ষত্র, যার আলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাবে।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও অধ্যাপক

লন্ডন, ১৭ মার্চ ২০২৬