কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬০ ।। বাংলাদেশের জুলাই যোদ্ধাদের ইনডেমনিটি: জনআন্দোলন, ইতিহাস ও ন্যায়ের প্রশ্ন

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬০ ।।  বাংলাদেশের জুলাই যোদ্ধাদের ইনডেমনিটি: জনআন্দোলন, ইতিহাস ও ন্যায়ের প্রশ্ন

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬০ ।।

 ।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।। 

বাংলাদেশের জুলাই যোদ্ধাদের ইনডেমনিটি: জনআন্দোলন, ইতিহাস ও ন্যায়ের প্রশ্ন

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে শুরু হওয়া ছাত্রদের আন্দোলন কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমিত থাকলেও খুব দ্রুত তা দেশব্যাপী অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। তরুণদের নেতৃত্বে, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সব শ্রেণি–পেশার মানুষ এতে অংশ নেন। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল শেখ হাসিনার পদত্যাগ, দুর্নীতি, সুযোগ–অসুবিধার সমতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা।

এই আন্দোলনের সময় প্রায় ৮০০ মানুষ নিহত এবং প্রায় ২০ ০০০ আহত হয়েছেন বলে জানা যায়। কেউ অবশ্য বেশি বা কমও বলে থাকেন। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে শহর ও গ্রামে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, রাজপথে মিছিল, থানা–কার্যালয়ে আক্রমণ, এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলে। এই পরিস্থিতি একদিকে জনগণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষকে দেখায়, অন্যদিকে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া কঠোর এবং সহিংস ছিল।

অবশেষে, জনগনের এই বিরাট চাপের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশ ত্যাগ করেন। এরপর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ছাত্র ও সাধারণ জনগণের সমর্থনে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার দেশের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, নতুন নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক পুনর্মিলনের দায়িত্ব নেয়।

তবে ইদানিং একটি বিতর্কিত বিষয় উঠে আসে—জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের জন্য ইনডেমনিটি ঘোষণা। আইনগত অর্থে ইনডেমনিটি মানে হলো অতীতের সংঘর্ষ ও আইনভঙ্গের জন্য কোনো ব্যক্তিকে দায়মুক্তি দেওয়া, কিন্তু তা আন্দোলনের যুক্তিকথা বা ন্যায়ের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। এটি বরং একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে রাষ্ট্র বিচারবিহীন সহিংসতা ও সম্ভাব্য আরও সামাজিক বিভাজন এড়াতে এই সিদ্ধান্ত নেয়।

ইনডেমনিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠে—“অভ্যুত্থানটি কি তখনই অবৈধ ছিল?” এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে পাওয়া যায়। আন্দোলনের মূল দাবি, যা গণতান্ত্রিক অধিকার, সমতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অংশ ছিল, তা নৈতিক ও সামাজিক ভিত্তিতে শক্তিশালী। আইনগত কাঠামোর বাইরে সংঘটিত কিছু সহিংসতা বা সংঘর্ষ থাকলেও তা আন্দোলনের ন্যায্য দাবিকে অস্বীকার করে না। নাকি এটা ছিল ড. ইউনুসের সত্যিকারের ম্যাটিকুলাস ডিজাইন? ইনডিমিনিটি দিলে তো মনে হয় এটা সত্যিকারের আন্দোলন ছিল না। তাহলে কি কোটা আন্দোলনের একটা উসিলা করে শেখ হাসিনার সরকারকে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল? নইলে এখন আন্দোলনকারীদের কেন দায়মুক্তি দিতে হচ্ছে?

তাহলে কি জনগন ধরে নেবে যে, ইনডেমনিটি প্রদানের অর্থ হলো আন্দোলনকে অবৈধ বলা নয়। নাকি এটি একটি জটিল পরিস্থিতি সামলানোর রাজনৈতিক উপায়, যাতে অতীত সংঘর্ষের কারণে দেশ আরও বিশৃঙ্খল না হয়। যাই হোক, সে রায় আগামী দিনের উপর ছেড়ে দিয়ে আজকের কলাম শেষ করি। কারণ এখন লন্ডনে গভীর রাত। এদিকে প্রিয় জন্মভূমির চলমান সকল অবস্থায় মনে হয় দেশে গভীর রাত। তাই সাত সমুদ্র আর তেরো নদীর ওপার থেকে প্রার্থনা থাকলো এই অমানিশার রাত পেরিয়ে যেন আগামী মাসে একটা চমৎকার সোনালী দিনের সূচনা হয়।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬