হাসিনার অবসর, আওয়ামী লীগের রূপান্তর: আল জাজিরা সাক্ষাৎকারে জয়
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক: বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর অনিশ্চয়তার সময়ে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন শেখ হাসিনার ছেলে ও আওয়ামী লীগের আইসিটি বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। নির্বাসিত শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ, ‘হাসিনা যুগের’ সম্ভাব্য সমাপ্তি, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, জুলাই হত্যাকাণ্ড, সহিংসতার অভিযোগ, দুর্নীতি এবং ভারত প্রসঙ্গ—সবকিছু নিয়েই তিনি খোলামেলা মতামত তুলে ধরেন। এই সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন জয়। নিচে বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কোনো ভবিষ্যৎ আছে কি না—এই প্রশ্ন উঠছে। আপনি কী মনে করেন?
জয়: অবশ্যই আছে। আওয়ামী লীগ কোথাও যাচ্ছে না। এটা দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বড় রাজনৈতিক দল। আমাদের ৪০–৫০ শতাংশ ভোট আছে। আপনি কি মনে করেন ৪০–৫০ শতাংশ মানুষ হঠাৎ সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে দেবে? দেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ৬–৭ কোটি ভোটার আওয়ামী লীগের। তারা কি হঠাৎ সমর্থন বন্ধ করবে?
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, আপনার মা শেখ হাসিনা রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। তিনি দেশে ফিরলে কি আর রাজনীতিতে থাকবেন না?
জয়: না। তার বয়স হয়েছে—৭৮ বছর। এমনিতেই এটা তার শেষ মেয়াদ হওয়ার কথা ছিল। তিনি অবসর নিতে চাচ্ছেন।
প্রশ্ন: তাহলে কি এটাকে ‘হাসিনা যুগের সমাপ্তি’ বলা যায়?
জয়: সম্ভবত তাই।
প্রশ্ন: অর্থাৎ আওয়ামী লীগ যদি রাজনীতিতে ফেরে, শেখ হাসিনাকে ছাড়াই?
জয়: হ্যাঁ। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। এটা ৭০ বছর ধরে আছে। তাকে সঙ্গে নিয়ে অথবা তাকে ছাড়াই দল চলবে। কেউ তো চিরদিন বাঁচে না।
রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও ‘নিয়তির পরিহাস’
প্রশ্ন: রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা একটি বাজে ধারণা—এ কথা মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বলে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সময়েও তো নির্বাচন নিয়ে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। এখানে কি এক ধরনের আয়রনি নেই?
জয়: আওয়ামী লীগ কখনো কাউকে নিষিদ্ধ করেনি। জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল আদালতের রায়ে।
প্রশ্ন: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আওয়ামী লীগের সময়ের নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করেছে।
জয়: ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আমাদের জরিপ, আমেরিকানদের জনমত জরিপ—সবই দেখাচ্ছিল আওয়ামী লীগ বিপুল ব্যবধানে জয়ী হবে। আমাদের কোনো অনিয়মের প্রয়োজন ছিল না। প্রশাসনের ভেতরে কিছু লোক নিজেরাই এসব করেছে। এতে আমার মা ও আমি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। আমরা পরিচ্ছন্ন নির্বাচন চেয়েছিলাম। আমরা ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে জরিপ করেছিলাম। ওই আসনগুলোতে আমাদের সর্বনিম্ন জয়ের ব্যবধান ছিল ৩০ শতাংশ। তাই কোনো অনিয়মের দরকার ছিল না।
প্রশ্ন: ২০২৪ সালের নির্বাচন?
জয়: ২০২৪ সালের নির্বাচনে কোনো কারচুপি হয়নি। বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছিল, যা দুর্ভাগ্যজনক।
সহিংসতার আশঙ্কা ও হাদি হত্যা
প্রশ্ন: আপনি আগে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না—এতে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়। সরকার বলছে, এ কারণেই আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ।
জয়: আমি সহিংসতার হুমকি দিইনি। আমি বলেছি, কাউকে একেবারে কোণঠাসা করলে কী হতে পারে। আমরা সহিংসতা চাই না। আমাদের তো প্রতিবাদ করতেও দেওয়া হচ্ছে না। এখন বলুন, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ কী সহিংসতা করছে?
প্রশ্ন: আপনারা নিজেরাও নিপীড়নের শিকার—এমন দাবি করছেন।
জয়: গত বছরের জুলাইয়ের আন্দোলনের পর থেকে আমাদের শত শত কর্মী নিহত হয়েছেন। ত্রিশের বেশি মানুষ হেফাজতে মারা গেছেন। মাত্র গত সপ্তাহেই আমাদের দলের এক সংখ্যালঘু নেতা, একজন হিন্দু ভদ্রলোক, কারাগারে নিহত হয়েছেন।
প্রশ্ন: ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদি হত্যার পেছনে কি আওয়ামী লীগের হাত ছিল?
জয়: অবশ্যই না। এই মুহূর্তে যদি আমাদের হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সক্ষমতা থাকত, তাহলে কি এই রেজিম টিকে থাকত? আওয়ামী লীগের এমন সহিংস লোক নেই। হয়তো অন্য সংগঠনের থাকতে পারে।
প্রশ্ন: যাকে গুলি করার অভিযোগ, সে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিল বলে বলা হচ্ছে।
জয়: সে কতটা যুক্ত ছিল? তার কোনো পদ ছিল কি না? এসব না দেখেই সব দায় আওয়ামী লীগের ওপর চাপানো হচ্ছে।
জুলাই হত্যাকাণ্ড ও দায়
প্রশ্ন: ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান দমনে নির্মমতা দেখানো হয়েছে—এ নিয়ে কোনো অনুশোচনা আছে?
জয়: আমি বহুবার বলেছি—আমাদের সরকার পরিস্থিতি ঠিকভাবে সামলাতে পারেনি। মিসহ্যান্ডেল করেছে।
প্রশ্ন: শেখ হাসিনার নির্দেশে শত শত নিরস্ত্র বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন—এ অভিযোগ রয়েছে।
জয়: এটা সত্য নয়। আমার মা যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে চাইতেন, তাহলে তিনি এখনো ক্ষমতায় থাকতেন। তিনি বলেছিলেন, যদি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আক্রমণ হয়, শত শত মানুষ মারা যাবে। তিনি সেই রক্ত নিজের হাতে নিতে চাননি।
প্রশ্ন: অডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়—“যেখানে পাবে গুলি করবে।”
জয়: আল জাজিরা ও বিবিসি পুরো ক্লিপ প্রকাশ করেনি। সেখানে তিনি সশস্ত্র জঙ্গিদের বিরুদ্ধে শক্তি ব্যবহারের কথা বলেছেন। নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের জন্য নয়।
প্রশ্ন: তাহলে আবু সাঈদ, ইমন, মুগ্ধ—তারা কেন নিহত হলেন?
জয়: পরিস্থিতি তখন অত্যন্ত সহিংস ছিল। কিছু পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছিল। অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল।
প্রশ্ন: নিহতদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইবেন?
জয়: আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পরপরই আমার মা তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি পূর্ণ তদন্ত ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন: জাতিসংঘ বলছে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ১,৪০০।
জয়: আমাদের হিসাবে প্রায় ৮০০। ৫ আগস্টের পর ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছে। তাদের কে হত্যা করেছে?
প্রশ্ন: শেখ হাসিনা কি দায়ী নন?
জয়: আমি বলছি না তিনি দায়ী নন। আমি বলছি—বিচার সবার জন্য সমান হতে হবে। একতরফা বিচার মানেই বিচার নয়।
দুর্নীতি প্রসঙ্গ
প্রশ্ন: আপনার ও আপনার পরিবারের বিরুদ্ধে বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
জয়: সেই বাড়িগুলো কোথায়? আপনি এখন আমার একমাত্র বাড়িতেই বসে আছেন। এফবিআই তদন্ত করেছে। কোনো প্রমাণ নেই।
প্রশ্ন: টিউলিপ সিদ্দিক কেন পদত্যাগ করলেন?
জয়: তার বিরুদ্ধে মানহানিকর প্রচার হয়েছিল। কোনো দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি। ব্রিটিশ তদন্তে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।
প্রশ্ন: সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্যে শত শত বাড়ির বিষয়টি?
জয়: তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। সবার দায় আমি নিতে পারি না।
‘প্ল্যান বি’ ও ভারত
প্রশ্ন: ভারতে শেখ হাসিনার থাকা কি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই?
জয়: ভারতই তার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ।
প্রশ্ন: অন্য কোনো দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল?
জয়: না। কখনোই না। তিনি দেশে ফিরতে চান। একসময় তা সম্ভব হবে।
প্রশ্ন: প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে?
জয়: প্রত্যর্পণ বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই। ভারত সব নিয়ম অনুসরণ করবে।
প্রশ্ন: তাহলে কোনো ‘প্ল্যান বি’ নেই?
জয়: না। আমাদের কোনো প্ল্যান বি নেই। আমরা আত্মবিশ্বাসী, ভারত তাকে ফেরত পাঠাবে না।