১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ১০৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে

১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ১০৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে

বিশেষ সম্পাদকীয়

আজ ১৭ মার্চ—জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৭তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান এবং মাতা সায়েরা খাতুন। একটি পরাধীন জাতির ভেতর জন্ম নিয়েও তিনি হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীনতার প্রতীক, বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ব্রিটিশ শাসনামলের কঠিন বাস্তবতায় তাঁর বেড়ে ওঠা। কৈশোর থেকেই রাজনীতি ও সমাজচেতনায় ছিলেন সচেতন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে প্রথমবার কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের মতো প্রাজ্ঞ নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন এবং ১৯৪৭ সালে সেখান থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৪০ সালের পর থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবন এক ধারাবাহিক সংগ্রাম ও নেতৃত্বের ইতিহাস—

১৯৪০: সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ।
১৯৪৩: বেঙ্গল দুর্ভিক্ষে ত্রাণ কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন।
১৯৪৬: কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৪৭: বিএ ডিগ্রি অর্জন এবং দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা।
১৯৪৮: পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা এবং ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা।
১৯৪৯: আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন।
১৯৫২: ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ততার কারণে কারাবরণ।
১৯৫৪: ১৪ মে যুক্তফ্রন্ট সরকারের বয়ঃকনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে কৃষি, বন ও সমবায় মন্ত্রী পদে শপথ গ্রহণ; ৩০ মে সরকার বাতিল হলে ঢাকায় ফিরে গ্রেফতার হন।
১৯৫৫: পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হিসেবে পূর্ব বাংলার অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা।
১৯৫৬: ১৬ সেপ্টেম্বর কোয়ালিশন সরকারের শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতি দমন ও ভিলেজ-এইড দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।
১৯৫৭: ৩০ মে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ; ২৪ জুন থেকে ১৩ জুলাই চীনে সরকারি সফর।
১৯৫৮: আইয়ুব খানের সামরিক শাসনে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ কারাবাস।
১৯৬২: শিক্ষা আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে নেতৃত্ব প্রদান।
১৯৬৬: ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন।
১৯৬৮: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
১৯৬৯: ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত হন।
১৯৭০: সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় এনে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা।
১৯৭১: ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ; ২৫ মার্চ গ্রেপ্তার; ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।
১৯৭২: ১০ জানুয়ারি দেশে প্রত্যাবর্তন এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজ শুরু।
১৯৭৩: প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন।
১৯৭৪: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার উদ্যোগ।
১৯৭৫: রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন কাঠামো প্রবর্তনের উদ্যোগ; ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠ উচ্চারণ—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—আজও বাঙালির হৃদয়ে অনুরণিত হয়। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন মানেই সংগ্রাম, ত্যাগ এবং কারাবরণ। পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরের মধ্যে প্রায় ১৩ বছর—মোট ৪৬৮২ দিন—তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন। জীবনের বহু জন্মদিনও কেটেছে কারাগারের অন্ধকারে। তবু তিনি কখনো আপস করেননি, মাথা নত করেননি।

স্বাধীনতার পর তিনি একটি বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু সেই পথ দীর্ঘ হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে নয়, একটি জাতির ইতিহাসকে রক্তাক্ত করে দেয়।

বঙ্গবন্ধু নিজের জন্মদিন কখনো জাঁকজমকভাবে পালন করতেন না। সাদামাটা জীবনযাপন, মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধই ছিল তাঁর চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য। জন্মদিনেও তিনি থাকতেন কর্মমুখর, মানুষের মাঝে।

একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে—সেটি আমাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন।

বঙ্গবন্ধু কেবল অতীতের ইতিহাস নন—তিনি বর্তমানের প্রেরণা, ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। তাঁর ১০৭তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার হোক—তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলা, সত্যিকার অর্থে।