কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬৪ ।। এক বিদেশি কণ্ঠ, আমাদের স্বাধীনতার আত্মা: মার্ক টালিকে স্মরণ
কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬৪ ।।
এক বিদেশি কণ্ঠ, আমাদের স্বাধীনতার আত্মা: মার্ক টালিকে স্মরণ
উৎসর্গ
৭১ এর বাঙালির বিশ্বস্ত বন্ধু মার্ক টালির স্মৃতির প্রতি

কিছু মানুষ জন্ম নেন একটি ভূখণ্ডে, কিন্তু তাঁদের আত্মা বাস করে বহু মানুষের হৃদয়ে। মার্ক টালি ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। জন্মেছিলেন কোলকাতায়— তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানীতে ১৯৩৫ সালে। বেড়ে উঠেছেন উপমহাদেশের আলো-বাতাসে, ইতিহাসের ঘাত-প্রতিঘাতে। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর বন্ধন তৈরি হয়েছিল এক দেশের সঙ্গে— বাংলাদেশ।
তিনি বাঙালি ছিলেন না। তাঁর হাতে ছিল না কোনো রাইফেল, কাঁধে ছিল না কোনো ব্যাজ। তবু ১৯৭১ সালে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক নীরব যোদ্ধা। তাঁর অস্ত্র ছিল বিবেক। তাঁর শক্তি ছিল সত্য। আর তাঁর কণ্ঠ ছিল কোটি মানুষের আশার বাতিঘর।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ছিল এক ভয়াবহ অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হাঁটা একটি জনপদ। চারদিকে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, শরণার্থীর স্রোত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শুধু মানুষ হত্যা করছিল না, তারা হত্যা করছিল সত্যকেও। সেই সময় সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন কিছু সাহসী সাংবাদিক। মার্ক টালি ছিলেন তাঁদের অগ্রভাগে।
সন্ধ্যা নামলেই বাংলাদেশের মানুষ রেডিওর পাশে বসে পড়ত। কান পেতে থাকত বিবিসির তরঙ্গের দিকে। সবাই অপেক্ষা করত একটি কণ্ঠের জন্য—
“এটা বিবিসি লন্ডন… আমি মার্ক টালি বলছি…”
এই কণ্ঠ মানে ছিল ভরসা। এই কণ্ঠ মানে ছিল— আমরা একা নই। এই কণ্ঠ মানে ছিল— পৃথিবী জানছে, পৃথিবী দেখছে।
মার্ক টালি শুধু দূর থেকে খবর পড়তেন না। তিনি ঝুঁকি নিয়ে বাস্তবতার কাছে গেছেন। ২৫ মার্চের গণহত্যার পর পাকিস্তানি বাহিনী বিদেশি সাংবাদিকদের দেখাতে চেয়েছিল “স্বাভাবিক ঢাকা”। কিন্তু মার্ক টালি অনুমতি নিয়ে গিয়েছিলেন পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে। সেখানে তিনি দেখেছিলেন ধ্বংসস্তূপ, গুলির চিহ্ন, আতঙ্কিত মানুষ। তিনি ছবি তুলেছিলেন। তিনি সত্য দেখেছিলেন।
এক পর্যায়ে এক পাঞ্জাবি পুলিশ তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা— সম্ভবত একজন বাঙালি— তাঁর কাগজপত্র দেখে সেই পুলিশকে ধমক দেন। মার্ক টালি পরবর্তীতে বলেছেন, ওই বাঙালি অফিসারের সাহস তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। দখলদারত্বের মাঝেও যে মানুষের মেরুদণ্ড সোজা থাকতে পারে— সেটি তিনি সেদিন দেখেছিলেন।
এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর রিপোর্টে রক্তমাংসের বাস্তবতা এনে দিয়েছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধকে কখনো কেবল “ভারত-পাকিস্তান সংঘাত” হিসেবে দেখাননি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন— এটি একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের লড়াই।
মার্ক টালির সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল মানবিকতা। তিনি ক্ষমতাবানদের ভাষায় কথা বলতেন না। তিনি কথা বলতেন নিপীড়িত মানুষের চোখ দিয়ে।
তাঁর রিপোর্টে রাজনীতি থাকত, কিন্তু রাজনীতির চেয়েও বেশি থাকত মানুষ। থাকত এক মায়ের কান্না, এক শরণার্থীর ক্লান্ত মুখ, এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধার দৃঢ় চোখ।
এই কারণেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের তরুণ যোদ্ধাদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রেরণার নাম। তাঁর কণ্ঠ শুনে অনেকে বিশ্বাস করত— আমাদের ত্যাগ বৃথা যাচ্ছে না।
মুক্তিযুদ্ধের পরও মার্ক টালি দক্ষিণ এশিয়ার পাশে থেকেছেন। তিনি দেখেছেন উপমহাদেশের বহু রক্তাক্ত অধ্যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আলাদা।
বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ দিয়েছে। কিন্তু সত্য কথা হলো— এই সম্মাননার আগেই বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে হৃদয়ের সম্মাননা দিয়ে ফেলেছিল।
আজকের নতুন প্রজন্ম হয়তো ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকের যুগে বড় হচ্ছে। তাদের কাছে “রেডিওর পাশে বসে খবর শোনা” গল্পের মতো শোনাতে পারে। কিন্তু তাদের জানা দরকার— এক সময় একটি কণ্ঠ পুরো জাতির সাহস হয়ে উঠেছিল।
মার্ক টালি আমাদের শেখান, সাংবাদিকতা মানে শুধু পেশা নয়— এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। সাংবাদিকতা মানে সত্যের পাশে দাঁড়ানো, এমনকি সেই সত্য অস্বস্তিকর হলেও।
তিনি দেখিয়ে গেছেন, একজন বিদেশি হয়েও একটি দেশের মুক্তির সংগ্রামে গভীরভাবে যুক্ত হওয়া যায়। কারণ মানবতা কোনো সীমান্ত মানে না।
আজ মার্ক টালি নেই। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন এক অমর উত্তরাধিকার—
সত্যের প্রতি অবিচল থাকার সাহস।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি চিরকাল থাকবেন এক বিদেশি বন্ধু হিসেবে,
এক নীরব মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে,
এক বিবেকবান কণ্ঠ হিসেবে।
এ জাতি কৃতজ্ঞতা নিয়ে উচ্চারণ করবে—
মার্ক টালি।
লেখক : সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
২৫ জানুয়ারি, ২০২৬