বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বস্ত কণ্ঠ মার্ক টালি আর নেই
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক রিপোর্ট : ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সত্য ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানো ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির কিংবদন্তি সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই। নয়া দিল্লির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবরে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার গণমাধ্যম অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে বিবিসি রেডিওতে মার্ক টালির কণ্ঠ ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক অনন্য ভরসার নাম। পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার বিপরীতে তিনি যে সত্যনিষ্ঠ ও মানবিক সংবাদ পরিবেশন করতেন, তা শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়—সারা বিশ্বের বিবেকবান শ্রোতাদের নাড়িয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তার ভূমিকা ছিল অসামান্য।
দ্য কাশ্মির মনিটরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্ক টালি দীর্ঘ সময় ধরে বিবিসির দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান প্রতিবেদক ও ভারতীয় ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন বিবিসির সবচেয়ে বিশ্বস্ত কণ্ঠস্বরগুলোর একজন। সংবেদনশীল, নিরপেক্ষ ও গভীর প্রেক্ষাপটনির্ভর প্রতিবেদনের মাধ্যমে জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করার অসাধারণ দক্ষতা ছিল তার।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করা হয়। এটি তার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক।
মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতার প্রত্যক্ষ সাক্ষী
একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন মার্ক টালি। কয়েক বছর আগে দিল্লি থেকে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সে সময় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে তাকে কয়েকটি এলাকা ঘুরিয়ে দেখায়।
মার্ক টালি বলেন, “অনুমোদন পেয়ে ঢাকার শাঁখারীবাজারে যাই। সেখানে ব্যাপক গোলাগুলি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। আমি বেশ কিছু ছবি তুললাম। হঠাৎ এক পাঞ্জাবি পুলিশ এসে আমাকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমার চলাচলসংক্রান্ত ফাইল দেখে আমাকে আটক করায় ওই পুলিশকে ধমক দেন। ওসি সম্ভবত বাঙালি ছিলেন। তার সাহস দেখে আমি মুগ্ধ হই। ওই সময় এটি ছিল অনন্যসাধারণ এক কাজ।”
এই অভিজ্ঞতা তার সাংবাদিকতার মানবিক দিককে আরও দৃঢ় করে তোলে। যুদ্ধের নৃশংসতা ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তুলে ধরাই হয়ে ওঠে তার প্রধান লক্ষ্য।
আশার আলো হয়ে উঠেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মার্ক টালি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক ধরনের আশার আলো। সকাল-সন্ধ্যা বিবিসিতে তার কণ্ঠ শোনার জন্য দেশের মানুষ রেডিওর পাশে বসে থাকত। তার কণ্ঠের দৃঢ়তা ও স্পষ্টতা তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের বুকেও ছড়িয়ে দিত সাহস ও প্রত্যয়।
দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল কর্মজীবন
১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দেন মার্ক টালি। পরের বছরই দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা হিসেবে ভারতে চলে আসেন। কর্মজীবনে তিনি এই অঞ্চলের বহু ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও প্রতিবেদক ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে—
-
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ
-
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ
-
ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা
-
অপারেশন ব্লু স্টার
-
ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড
-
শিখবিরোধী দাঙ্গা
-
রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড
এসব ঘটনা তিনি বিবিসিতে অত্যন্ত সহজ, সাবলিল ও দায়িত্বশীল ভঙ্গিতে তুলে ধরেন, যা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার মানদণ্ডে অনুকরণীয়।
বিবিসি ছাড়ার পরও সক্রিয়
১৯৯৪ সালের জুলাইয়ে বিবিসি থেকে পদত্যাগ করেন মার্ক টালি। সহকর্মী জন বার্টের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। তখন তিনি অভিযোগ করেছিলেন, বিবিসিকে ‘ভীত হয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে’ এবং এতে প্রতিষ্ঠানটির মান ও সাংবাদিকদের নৈতিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরপর থেকে তিনি স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করেন এবং নয়া দিল্লিতে উপস্থাপক ও লেখক হিসেবে কাজ চালিয়ে যান।
শ্রদ্ধা ও উত্তরাধিকার
মার্ক টালির মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক ও দক্ষিণ এশীয় গণমাধ্যম, সাংবাদিক সমাজ, গবেষক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই তাকে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রতীক এবং আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করছেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি শুধু একজন বিদেশি সাংবাদিক নন—তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক বিশ্বস্ত বন্ধু, মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো এক সাহসী কণ্ঠ। তাঁর প্রয়াণে বিশ্ব সাংবাদিকতা হারাল এক নৈতিক অভিভাবককে, আর বাংলাদেশ হারাল এক অকৃত্রিম শুভাকাঙ্ক্ষীকে।