কলিকালের কলধ্বণি--৫০ ।। যীশুর জন্মদিন, ইতিহাস ও বিশ্বাসের ব্যবধান
কলিকালের কলধ্বনি-পর্ব ৫০
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর।।

আজ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বড়দিন পালিত হচ্ছে। ব্রিটেনসহ সারা বিশ্বেই আজ সরকারি ছুটি। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ ঘরে ঘরে আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জনদের নিয়ে খ্রিস্টমাস উদযাপন করছেন। আনন্দ, প্রার্থনা ও পারস্পরিক শুভেচ্ছার মধ্য দিয়ে দিনটি কাটছে। এমন একটি দিনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে—যে দিনটিকে যীশু খ্রিস্টের জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়, ইতিহাস ও ধর্মগ্রন্থ সে বিষয়ে কী বলে?
এই প্রশ্ন তোলার অর্থ যীশুর প্রতি বিশ্বাস অস্বীকার করা নয়। বরং এটি ইতিহাস, ধর্মগ্রন্থ ও মানবসভ্যতার স্মৃতি কীভাবে গড়ে ওঠে, সে বিষয়ে জানার একটি স্বাভাবিক কৌতূহল। অনেক পাঠকের কৌতুহল নিবারণ। উল্লেখ্য, মুসলিমগণ যীশুকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে মুসা আ: বলে শ্রদ্ধা করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, মুসা বা যে কোন নবী বা রাসুলগনের উপর ঈমান বা বিশ্বাস না থাকলে তিনি মুসলিম বলেই গন্য হবে না।

খ্রিস্টানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বাইবেল, বিশেষ করে নতুন নিয়মে, যীশুর জন্মের কাহিনি বিস্তারিতভাবে আছে। মথি ও লূক তাঁর জন্মস্থান, পারিপার্শ্বিকতা এবং সেই সময়কার ঘটনাবলি তুলে ধরেছেন। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষণীয়—কোথাও তাঁর জন্মের নির্দিষ্ট দিন বা মাস উল্লেখ নেই। মার্ক ও যোহনের গসপেলে তো জন্মকাহিনির বিবরণই নেই। অর্থাৎ, বাইবেল নিজেই যীশুর জন্মদিন নির্ধারণের বিষয়ে নীরব।
ইতিহাসও এই নীরবতাকে সমর্থন করে। প্রথম তিন শতাব্দীর খ্রিস্টান সমাজে বড়দিন উদযাপনের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিকদের মতে, ২৫ ডিসেম্বরকে যীশুর জন্মদিন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের প্রথম লিখিত রেকর্ড পাওয়া যায় খ্রিস্টাব্দ ৩৩৬ সালে, রোমে। এটি ছিল সেই সময়, যখন খ্রিস্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে।
২৫ ডিসেম্বরের এই তারিখটি কেন বেছে নেওয়া হলো, সে প্রশ্নে ইতিহাস একটি বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দেয়। প্রাচীন রোমে এই দিনটি ছিল সূর্যদেব Sol Invictus-এর উৎসবের দিন। একই সময়ে শীতকালীন অয়নান্ত ঘিরে নানা সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন চলত। বহু ইতিহাসবিদের মতে, নতুন ধর্মীয় বিশ্বাসকে সমাজে সহজে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চার্চ সেই প্রচলিত সাংস্কৃতিক সময়টিকেই ব্যবহার করেছিল।
আরেকটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় প্রাচীন খ্রিস্টান ধর্মতাত্ত্বিকদের লেখায়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে কিছু চিন্তাবিদ ধারণা দেন যে যীশুর গর্ভধারণ হয়েছিল ২৫ মার্চ। সেই হিসাব অনুযায়ী নয় মাস যোগ করে তাঁর জন্ম ২৫ ডিসেম্বর ধরা হয়। এটি ছিল একটি ধর্মতাত্ত্বিক ও প্রতীকী হিসাব, ঐতিহাসিক দলিলনির্ভর সিদ্ধান্ত নয়।
বাইবেলের ভেতরের ইঙ্গিতগুলোও ডিসেম্বরের সম্ভাবনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। লূকের গসপেলে বলা হয়েছে, যীশুর জন্মের সময় রাখালরা রাতে খোলা মাঠে পশুপাল পাহারা দিচ্ছিল। প্যালেস্টাইনের শীতকাল সাধারণত ঠান্ডা ও বৃষ্টিপূর্ণ হওয়ায়, বহু গবেষকের মতে এটি বসন্ত বা শরৎকালের সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই আলোচনায় ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোরআন ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.)-কে একজন সম্মানিত নবী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পবিত্র কোরআনের সূরা আলে ইমরান ও সূরা মারইয়ামে তাঁর জন্মের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এখানেও জন্মের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ নেই। বরং গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁর অলৌকিক জন্ম ও বার্তার ওপর।
বিশেষ করে সূরা মারইয়ামে ঈসা (আ.)-এর জন্মের সময় খেজুর গাছ থেকে তাজা খেজুর ঝরে পড়ার কথা বলা হয়েছে। বহু মুসলিম তাফসিরকার মনে করেন, তাজা খেজুর পাওয়ার এই বিবরণ গ্রীষ্মকাল বা খেজুর পাকার মৌসুমের দিকে ইঙ্গিত করে, যা ডিসেম্বর মাসের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তবে এখানেও তারিখ নয়, ঘটনাটির তাৎপর্যই মুখ্য।
এই সব তথ্য একত্রে রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—যীশুর জন্ম ঐতিহাসিক সত্য, কিন্তু ২৫ ডিসেম্বর তাঁর প্রকৃত জন্মদিন হওয়ার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ২৫ ডিসেম্বর মূলত একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা সময়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছে।
এ কথা বলার অর্থ বড়দিনের আনন্দ বা ধর্মীয় গুরুত্ব অস্বীকার করা নয়। বরং এটি মনে করিয়ে দেয় যে ধর্মীয় উৎসব অনেক সময় ইতিহাসের চেয়ে বিশ্বাস, প্রতীক ও মানবিক স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন ঐতিহ্যকে অচল ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
তথ্যসূত্র
১. The Holy Bible, New Testament: Gospel of Matthew, Gospel of Luke
২. The Holy Qur’an: Surah Al-Imran (3:45–47), Surah Maryam (19:16–34)
৩. Encyclopaedia Britannica, “When Was Jesus Born?”
৪. Eusebius of Caesarea, Church History
৫. Sextus Julius Africanus, Chronographiai
৬. Oxford Companion to Christian Thought
৭. Diarmaid MacCulloch, A History of Christianity