৫০০ টাকার বাজি,  ১০০টি ডুব এবং ৪৫ বছরের জীবন

৫০০ টাকার বাজি,  ১০০টি ডুব এবং ৪৫ বছরের জীবন

ভয়েস অব পিপল ডেস্ক, ২৫ ডিসেম্বর:  শীতের সকালে খালের পানি যেমন হিম, মানুষের অসচেতনতাও তেমনি ঠান্ডা আর নির্মম। ঝালকাঠির রাজাপুরের বড়ইয়া কাছারি বাড়ি বাজারে আজ যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা কেবল একটি দুর্ঘটনার খবর নয়—এটি আমাদের সমাজের গভীর অসাড়তা, বেঁচে থাকার লড়াই আর মূল্যহীন হয়ে যাওয়া জীবনের এক করুণ দলিল।

বাবুল মোল্লা। বয়স মাত্র ৪৫। একজন কৃষক। ভোরের সকালে মাথায় এক বস্তা চাল নিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে বাজারে এসেছিলেন। এই ছবিটা আমাদের চেনা—গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে এমন বাবুল মোল্লারা আছেন। ঘাম ঝরিয়ে, শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে পরিবার চালান। সেই শ্রমের মানুষটিই শীতের সকালে শরীর গরম করতে গিয়ে, এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাজির ফাঁদে পড়ে জীবন হারালেন।

৫০০ টাকার বাজি। শর্ত—পাশের খালে নেমে একটানা ১০০ বার ডুব। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এটাই সত্য। অবাক লাগে, আরও বেশি কষ্ট দেয় এই ভেবে যে, আশপাশে থাকা মানুষজন কেউ একজনও বলেনি—“থামো, এটা বিপজ্জনক।” বরং বাজির উত্তেজনায়, মজা আর কৌতুকের ভিড়ে এক কৃষকের জীবন হয়ে উঠেছিল প্রদর্শনীর বস্তু।

বাবুল মোল্লা বাজি জেতার জন্য ১০০ বার ডুব দিয়েছেন। তিনি জিতেছিলেন কি না, সে খবর আর কোনো অর্থ বহন করে না। কারণ ডুব শেষ করে খালের পাড়ে উঠে আসার পরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঠান্ডা শরীর, অতিরিক্ত পরিশ্রম, সম্ভবত হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তন—সব মিলিয়ে শরীর আর পারেনি। কম্বল জড়ানো হলো, আগুন পোহানো হলো, কিন্তু ততক্ষণে সময় হাতছাড়া। রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এই মৃত্যু শুধু বাবুল মোল্লার পরিবারের শোক নয়। এটি আমাদের সবার ব্যর্থতা। আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে দরিদ্র মানুষের শরীর, শ্রম আর জীবন অনেক সময়ই তুচ্ছ বিনোদনের উপকরণ হয়ে দাঁড়ায়। ৫০০ টাকা—এই সামান্য অঙ্কটি হয়তো বাবুলের কাছে বড় কিছু ছিল। হয়তো সেই টাকায় বাজার হতো, ঘরে কিছুটা স্বস্তি আসত। সেই আশাই তাঁকে ঠেলে দিয়েছে ঝুঁকির দিকে।

প্রশ্ন উঠবেই—এটি কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি সামাজিক অবহেলা? যারা এই বাজিতে অংশ নিয়েছিল, যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিল, তাদের কি কোনো দায় নেই? আইন হয়তো অভিযোগ ছাড়া এগোবে না, কিন্তু বিবেকের আদালতে এই মৃত্যু আমাদের সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

রাজাপুর থানার ওসি বলেছেন, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু অনেক সময় আইন পৌঁছানোর আগেই মানুষের জীবন চলে যায়। তখন কাগজে মামলা না থাকলেও খরচের খাতার ইতিহাসে থেকে উঠে যায় —বাবুল মোল্লাদের মতো মানুষের নাম। বাবুল মোল্লা- একজন কৃষক, একজন বাবা, একজন শ্রমজীবী মানুষ, যিনি ৫০০ টাকার এক বাজিতে হারিয়ে গেলেন।

এই শীতের সকালে খালের ঠান্ডা পানি হয়তো এখনো বইছে। বাজারে হয়তো আবার মানুষের কোলাহল। কিন্তু একটি পরিবার আজ নিঃস্ব। এই মৃত্যু যেন আমাদের অন্তত এটুকু শেখায়—মানুষের জীবন কোনো বাজির বিষয় নয়। হাসি-তামাশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই নির্মমতা বন্ধ না হলে, বাবুল মোল্লাদের মৃত্যু থামবে না।