প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসকে অ্যামনেস্টির খোলা চিঠি: নির্বাচন সামনে রেখে মৌলিক অধিকার সুরক্ষার আহ্বান

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসকে অ্যামনেস্টির খোলা চিঠি: নির্বাচন সামনে রেখে মৌলিক অধিকার সুরক্ষার আহ্বান

 ভয়েস অব পিপল ডেস্ক রিপোর্ট, ২৮ জানুয়ারি: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে খোলা চিঠি লিখেছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড। মানবাধিকার রক্ষা ও উন্নয়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠনমূলক সংলাপের অংশ হিসেবে আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উদ্বেগ ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে।

গত সোমবার (২৬ জানুয়ারি) লেখা এই চিঠিটি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

চিঠিতে ক্যালামার্ড বলেন, বাংলাদেশ যখন অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি প্রধান উপদেষ্টাকে লিখছেন। এ সময়টি যেমন বড় দায়িত্বের, তেমনি জনআস্থা পুনরুদ্ধার, সুশাসন জোরদার এবং মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পূর্ণ সম্মান নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে ধারাবাহিক বিভিন্ন সরকারের আমলে বাংলাদেশে গুরুতর ও স্থায়ী মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার আটক, নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক বা অপমানজনক আচরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ এবং সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক বিরোধী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা। এসব ঘটেছে এমন এক প্রেক্ষাপটে, যেখানে নাগরিক পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দুর্বল ছিল এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের জন্য দায়মুক্তি গভীরভাবে প্রোথিত ছিল।

চিঠিতে বলা হয়, এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা, আইনের শাসনের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা এবং অর্থবহ মানবাধিকার সংস্কারের সূচনা করার একটি ব্যতিক্রমী সুযোগ রয়েছে। অ্যামনেস্টি স্বীকার করেছে যে সরকার ‘গুম থেকে সকল ব্যক্তিকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক কনভেনশন’ এবং ‘নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকল (ওপিসিএটি)’ অনুসমর্থনের মতো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে কাঠামোগত পরিবর্তনে সময় লাগলেও, বাংলাদেশে সকল মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষায় এখনো গুরুতর চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে বাংলাদেশের জন্য একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করে ক্যালামার্ড বলেন, এই নির্বাচন এমন একটি নতুন পথ নির্ধারণের সুযোগ এনে দিয়েছে, যেখানে দেশের সকল মানুষের অধিকার ও মর্যাদা কেবল সম্মানিতই হবে না, বরং বিকশিত হবে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর), নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন (সিএটি) এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সনদসহ (সিইএসসিআর) একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির পক্ষভুক্ত হলেও, এসব মানদণ্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনও নানা বাধা রয়েছে।

নির্বাচন-পূর্ব সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং সংগঠনের স্বাধীনতাকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন, ছাত্রসংগঠন, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজ সংগঠনসহ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলো যেন ভয়ভীতি, নজরদারি, হয়রানি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই কথা বলতে, সংগঠিত হতে ও শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হতে পারে—এটি নিশ্চিত করা অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব।

চিঠিতে সন্ত্রাসবিরোধী আইন (এটিএ) সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়। উদাহরণ হিসেবে ২৮ আগস্ট সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না এবং ১৫ ডিসেম্বর সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনের অভিযোগে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করার একটি উদ্বেগজনক ধারা হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

এছাড়া ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর সহিংসতায় দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা, নিউ এজ-এর সম্পাদক নুরুল কবিরকে হয়রানি এবং সংখ্যালঘু হিন্দু পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে মানবাধিকারের গুরুতর ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

চিঠির শেষাংশে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অন্তর্বর্তী সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে—আসন্ন নির্বাচনের কেন্দ্রে মানবাধিকার সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে। এর মধ্যে সাংবাদিক ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা আইন অপব্যবহার বন্ধ করা, অধিকার প্রয়োগকারীদের সুরক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত ও আইনসম্মত ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমকর্মী ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

অ্যামনেস্টি সতর্ক করে বলেছে, নির্বাচন-পূর্ব সময়কাল হবে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও আইনের শাসনের প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের অঙ্গীকারের এক কঠিন পরীক্ষা, যা আগামী বহু বছর ধরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।