খেলাপি ঋণ রুখতে কঠোর প্রস্তাব ব্যাংকারদের: নাম–ছবি প্রকাশ ও বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞা

খেলাপি ঋণ রুখতে কঠোর প্রস্তাব ব্যাংকারদের: নাম–ছবি প্রকাশ ও বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞা

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৮ জানুয়ারি:  দেশের ব্যাংকিং খাতে দ্রুত বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ কমানো এবং নগদ অর্থ আদায় জোরদার করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি বিস্তৃত প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। প্রস্তাবনায় ঋণখেলাপিদের নাম ও ছবি প্রকাশের অনুমতি, আদালতের নির্দেশনা ছাড়া বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণার মতো কঠোর ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে।

গত বছরের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে এবিবির বৈঠকের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে সংগঠনটি এই প্রস্তাবনা জমা দেয়। এতে খেলাপি ঋণ হ্রাস, নগদ আদায় বৃদ্ধি, বন্ধকী সম্পদ বিক্রি সহজ করা এবং অর্থঋণ মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

খেলাপি ঋণ কমাতে তিন দফা প্রস্তাব

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে এবিবি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আংশিক অবলোপনের সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি লিয়েন করা শেয়ার দ্রুত নগদায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া মৃত্যু, মরণব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহঋণ, ক্রেডিট কার্ড এবং একক মালিকানাধীন কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সুদ মওকুফের মাধ্যমে দ্রুত আদায়ের লক্ষ্যে হেড অব আইসিসির মতামত নেওয়ার শর্ত শিথিল করার সুপারিশ করা হয়েছে।

নগদ অর্থ আদায় বাড়াতে কঠোর ব্যবস্থা

নগদ আদায় বাড়াতে ব্যাংকাররা খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিদেশ যাত্রায় ব্যাংক বা আদালতের নির্দেশনা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। একই সঙ্গে খেলাপিদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশে ব্যাংকগুলোকে অনুমোদন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের যেকোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করার প্রস্তাব রয়েছে।

বন্ধকী সম্পদ বিক্রি সহজ করার উদ্যোগ

ব্যাংকের নিলামে বিক্রয় বা কেনা সম্পত্তি হস্তান্তরে সব ধরনের আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে এবিবি। নিলামে সম্পদ কেনায় আগ্রহ বাড়াতে ক্রেতাদের আয়কর রেয়াত বা অন্যান্য প্রণোদনার কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা বাতিল, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত, বন্ধকদাতার অনুপস্থিতিতে ব্যাংক কর্তৃক জমির খাজনা ও জরিপ সম্পন্নের সুযোগ এবং অর্থঋণ আদালত আইনের ৩৩(৭) ধারায় আদালত কর্তৃক ব্যাংকের নামে হস্তান্তরিত জমির নামজারি ও বায়নানামা বিনা খরচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মামলার রায় দ্রুত কার্যকরে সুপারিশ

প্রস্তাবনায় খেলাপি ঋণগ্রহীতা ও জামানতদাতাদের আমানত, সঞ্চয়পত্র, সম্পদ, আয়কর রিটার্ন, ওয়ারিশ সনদ, জন্ম-মৃত্যু সনদ ও পাসপোর্টসংক্রান্ত তথ্য আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই দ্রুত পাওয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংক বা আদালতের যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতে গেলে নির্দিষ্ট অঙ্কের ডাউন পেমেন্ট জমার শর্ত, সিআইবি প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের স্টে-অর্ডার পাওয়ার সুযোগ বাতিল এবং স্টে-অর্ডারের ক্ষেত্রে কিস্তিভিত্তিক উল্লেখযোগ্য অঙ্ক পরিশোধের শর্ত আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
খেলাপি ঋণ বেশি এমন জেলাগুলোতে পৃথক অর্থঋণ আদালত স্থাপন, থানায় আটকাদেশ দ্রুত বাস্তবায়ন, অর্থঋণ মামলায় ব্যক্তিগত হাজিরা ছাড়া মামলা পরিচালনার সুযোগ বাতিল এবং দেওয়ানি আটকাদেশের মেয়াদ ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাত বছর করার প্রস্তাবও রয়েছে।

খেলাপি ঋণ না বাড়াতে আগাম ব্যবস্থা

ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ বাড়া ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীর তালিকা দ্রুত প্রকাশ, নিবন্ধক বা তহবিল অফিসে বন্ধকী সম্পদের তালিকা সহজে যাচাইয়ের ব্যবস্থা এবং সিআইবি ডেটাবেজের মতো ব্যক্তিগত সম্পদের ডেটাবেজ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে এবিবি।

খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র

বর্তমানে দেশে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের বড় অংশই খেলাপি। প্রতি মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। সর্বশেষ হিসাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ সময়ে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা।

ব্যাংকারদের মতে, প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে খেলাপি ঋণের লাগাম টানা সম্ভব হবে। অন্যথায় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে খেলাপিরা আবারও সুযোগ নিয়ে ব্যাংক খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।