সিলেটের শিকড় থেকে লন্ডন, লন্ডন পেরিয়ে নিউইয়র্কের আন্তর্জাতিক শিল্পমঞ্চে ‘Paper Painting’

কাগজের স্তরে স্তরে গল্প আঁকেন বাইস কাদির

কাগজের স্তরে স্তরে গল্প আঁকেন বাইস কাদির

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৮ সেপ্টেম্বর :

কাগজে ছবি আঁকা নতুন কিছু নয়। কিন্তু কাগজকেই যখন ছবির প্রধান উপাদান বানিয়ে একটি কাজকে স্তরের পর স্তরে নির্মাণ করা হয়, তখন সেটি আর সাধারণ চিত্রকর্ম থাকে না। হয়ে ওঠে একটি আলাদা শিল্পভাষা।

বাংলাদেশি শিল্পী বাইস কাদির প্রায় তিন দশকের গবেষণা ও সৃজনশীল পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এমনই একটি নিজস্ব শিল্পধারা গড়ে তুলেছেন—‘Paper Painting’।

সিলেটে জন্ম নেওয়া বাইস কাদিরের সৃজনশীল পরিচয় শুধু চিত্রশিল্পীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভিজ্যুয়াল আর্টের পাশাপাশি সাহিত্য, ফটোগ্রাফি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা রয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত ও লন্ডনে তাঁর একাধিক একক প্রদর্শনী হয়েছে। তাঁর লেখা ও শিল্পকর্ম বিভিন্ন প্রকাশনাতেও প্রকাশিত হয়েছে।

তবে তাঁর শিল্পী পরিচয়ের সবচেয়ে আলাদা অধ্যায় সম্ভবত Paper Painting।

এই শিল্পধারা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বাইস কাদির প্রচলিত ক্যানভাসের ধারণা থেকে সরে এসেছেন। তাঁর কাছে কাগজ শুধু ছবি আঁকার জায়গা নয়—কাগজই ছবির শরীর।

একটি কাগজের ওপর আরেকটি কাগজ। তার সঙ্গে শক্তিশালী সিনথেটিক রেজিন আঠা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য উপকরণ। এভাবে ধাপে ধাপে তৈরি হয় একেকটি শিল্পকর্ম। প্রতিটি স্তর বসাতে প্রয়োজন সময়, ধৈর্য ও সূক্ষ্মতার।

শিল্পীর নিজের ভাষায়, Paper Painting তৈরির পদ্ধতিটি প্রায় তিন দশকের গবেষণা ও সৃজনশীল বিকাশের ফল। প্রতিটি কাজ সম্পূর্ণ করতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং যথাযথ সংরক্ষণ ও যত্নে এগুলো দীর্ঘদিন টিকে থাকার উপযোগী করে তৈরি করা হয়।

ছবির ভেতরেও থাকে আরেক ছবি

বাইস কাদিরের শিল্পের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—প্রতিটি কাজের পেছনে থাকে একটি গল্প।

কাজ শুরু করার আগে তিনি প্রথমে একটি ধারণা ও গল্প নিজের মনে তৈরি করেন। তারপর সেই ভাবনাকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন পর্যায়ে, স্তরের পর স্তর, শিল্পকর্মে রূপ দেন।

তাই তাঁর ছবি দেখার সময় শুধু ওপরের দৃশ্যটি দেখলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। দর্শকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—এর নিচে কী আছে? কেন এত স্তর? এই দৃশ্যের পেছনের গল্প কী?

এখানেই তাঁর শিল্পকর্মের সঙ্গে দর্শকের সম্পর্কটি একটু অন্যরকম হয়ে ওঠে।

একটি ছবি যেন শুধু দেখা নয়, পড়ারও বিষয়।

নামের মধ্যেও গল্প

বাইস কাদিরের Paper Painting-এর কয়েকটি কাজ ইতোমধ্যে ARTmine-এ প্রদর্শিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘Dishevelled’ (২০১৫), ‘Tales Of Dream’ (২০১২), ‘Phoses Of Life’ (২০১২), ‘Hunting Of Crucital Period’ (২০১৪) এবং ‘Broken Life’ (২০১৪)।

নামগুলোও তাঁর শিল্পভাবনার একটি ইঙ্গিত দেয়—স্বপ্ন, জীবন, সময়, ভাঙন কিংবা অস্থিরতার মতো অনুভূতি তাঁর কাজের বিষয়বস্তুর সঙ্গে যুক্ত।

একেকটি কাজ তাই একেকটি আলাদা গল্পের দরজা খুলে দেয়।

লন্ডনে Paper Painting-এর নতুন অধ্যায়

ব্রিটেনে দীর্ঘদিনের বসবাস ও শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে বাইস কাদির তাঁর কাজকে নতুন দর্শকের সামনে নিয়ে এসেছেন।

২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত লন্ডনের Brady Arts & Community Centre Gallery-তে তাঁর নতুন Paper Painting প্রদর্শিত হয়। শিল্পীর নিজের তথ্য অনুযায়ী, এটি ছিল তাঁর এই বিশেষ ধরনের কাজের প্রথম প্রদর্শনী; এর আগে তিনি বহু একক প্রদর্শনী করলেও এই নির্দিষ্ট Paper Painting ধারাটি তখনও প্রকাশ্যে প্রদর্শন করেননি।

লন্ডনের সেই প্রদর্শনীর পর তাঁর Paper Painting এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রদর্শিত হচ্ছে।

এবার নিউইয়র্ক

৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর নিউইয়র্কের চেলসির Agora Gallery-তে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘New York, I Love You’ প্রদর্শনীতে বাইস কাদিরের কয়েকটি Paper Painting স্থান পেয়েছে। ARTmine-এ বর্তমানে তাঁর পাঁচটি Paper Painting তালিকাভুক্ত রয়েছে।

অর্থাৎ সিলেটের মাটি থেকে শুরু হওয়া একজন শিল্পীর সৃজনযাত্রা এখন লন্ডনের শিল্পপরিসর পেরিয়ে নিউইয়র্কের আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনে নতুন দর্শকের সামনে দাঁড়াচ্ছে।

একজন শিল্পীর পরিচয় শুধু তাঁর ছবিতে নয়

বাইস কাদিরের জীবন ও শিল্পচর্চার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি নিজেকে একটি মাত্র মাধ্যমে আটকে রাখেননি।

শিল্প, সাহিত্য, ফটোগ্রাফি ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁর সৃজনশীল পরিচয়কে বহুমাত্রিক করেছে। আর সেই অভিজ্ঞতার মধ্য থেকেই Paper Painting-এর মতো নিজস্ব একটি শিল্পভাষা তৈরি হয়েছে।

একজন শিল্পী যখন নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে—তিনি কি নিজের আলাদা ভাষা তৈরি করতে পারছেন?

বাইস কাদিরের ক্ষেত্রে সেই ভাষার নাম এখন Paper Painting।

সাধারণ কাগজ, অসাধারণ গল্প

কাগজ আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অত্যন্ত সাধারণ একটি বস্তু। সেখানে লেখা হয়, ছবি ছাপা হয়, হিসাব রাখা হয়, তারপর একসময় সেটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।

বাইস কাদির সেই সাধারণ কাগজকেই অন্য জীবন দিয়েছেন। ২০১০ সালের The Financial Express-এর আর্কাইভে তাঁর ‘Simply Art’ শিরোনামের ১১তম একক প্রদর্শনীর খবর আছে। সেখানে বলা হয়েছে, ঢাকার Drik Gallery-তে তাঁর ৪৬টি চিত্র প্রদর্শিত হয়েছিল এবং ছবিগুলো লন্ডনে আঁকা।

একটি স্তরের নিচে আরেকটি স্তর। দৃশ্যমান ছবির নিচে অদৃশ্য নির্মাণ। আর সবকিছুর ভেতরে একটি গল্প।

প্রায় তিন দশকের গবেষণার পর তাঁর এই শিল্পভাষা এখন আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে। লন্ডনে যার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল, নিউইয়র্কে তা আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছাচ্ছে।

কাগজ তাই তাঁর হাতে আর শুধু কাগজ নয়।

সেটি হয়ে উঠেছে সময়, স্মৃতি, জীবন ও গল্পের স্তর।

আর সেই স্তরের পর স্তরেই নিজের শিল্পী-পরিচয় নির্মাণ করে চলেছেন বাইস কাদির।