সিলেট সংবাদ
শাহজালাল মাজারে তিন মাসে দান সোয়া দুই কোটি টাকা, প্রশ্ন হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে
সিলেট প্রতিনিধি, ১৯ সেপ্টেম্বর:
মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্স ও দানের ডেগে জমা পড়েছে ২ কোটি ২৪ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪০ টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে স্বর্ণ, রুপা, বিভিন্ন দেশের মুদ্রা এবং গবাদিপশু। প্রকাশ্যে দানের অর্থ গণনার নতুন এই ধারায় একের পর এক বড় অঙ্কের হিসাব সামনে আসায় মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের ২২ জুন থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার দফায় দানের অর্থ গণনা করা হয়। প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী—
২২ জুন: চার দিনে পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। সঙ্গে ছিল স্বর্ণ ও সৌদি আরবের মুদ্রা।
১১ জুলাই: পরবর্তী ১৯ দিনে পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। পাশাপাশি পাওয়া যায় বিভিন্ন দেশের মুদ্রা, স্বর্ণ, রুপা এবং গবাদিপশু।
১৫ আগস্ট: ৩৪ দিনে দানবাক্সে জমা পড়ে ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা। এর সঙ্গে ছিল স্বর্ণ, রুপা ও ১৯ ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা।
১৯ সেপ্টেম্বর: সর্বশেষ ৩৪ দিনে পাওয়া যায় ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৬ টাকা। সঙ্গে পাওয়া গেছে ১ ভরি ৯ আনা ২ রতি স্বর্ণ এবং ১৫ দেশের মুদ্রা।
এই চার দফার নগদ অর্থ যোগ করলে দাঁড়ায় ২ কোটি ২৪ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪০ টাকা।
তবে এই হিসাবের মধ্যে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। প্রথম দফায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজারের ব্যাংক হিসাবে অতিরিক্ত ৫ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়েছিল। সেটি দানবাক্স থেকে পাওয়া অর্থ নয়, তাই ২ কোটি ২৪ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪০ টাকার মধ্যে তা ধরা হয়নি। প্রথম তিন দফার পর দানের অর্থ ও ওই ৫ লাখ টাকা মিলিয়ে তহবিলের পরিমাণ ১ কোটি ৪০ লাখ ৬৪ হাজার ৩৭৪ টাকা হয়েছিল বলে বিডিনিউজ২৪ জানিয়েছে।
শুধু টাকা নয়, দানের সঙ্গে আসছে বিপুল পরিমাণ সামগ্রীও। ১৫ আগস্টের গণনায় স্বর্ণ-রুপা ও বিদেশি মুদ্রার পাশাপাশি গরু-ছাগল পাওয়া যায়। ১৯ সেপ্টেম্বরের হিসাবে ছয়টি গরু ও ১১টি ছাগলের কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে লঙ্গরখানার খাবারের জন্য কিছু পশু জবাই করা হয়েছে, কিছু বিক্রি করে কর্মীদের মজুরি দেওয়া হয়েছে এবং একটি গরু ও একটি ছাগল দরিদ্র দুই মেয়ের বিয়েতে দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্নটা এখানেই।
প্রকাশ্যে দানের টাকা গণনা শুরু হওয়ায় অন্তত কত টাকা পাওয়া যাচ্ছে—সেই তথ্যটি এখন মানুষের সামনে আসছে। কিন্তু একটি মাজারে বছরে মোট কত টাকা আসে, কত টাকা ব্যয় হয়, কোন খাতে কত ব্যয় হয়, কর্মীদের বেতন কত, লঙ্গরখানায় কত খরচ হয়, রক্ষণাবেক্ষণে কত যায় এবং বছর শেষে কত টাকা অবশিষ্ট থাকে—এসবের পূর্ণাঙ্গ হিসাবও কি নিয়মিত প্রকাশ করা হবে?
কারণ ২২ জুনের আগে মাজারের দানের অর্থ এভাবে জনসম্মুখে গণনার নজির ছিল না। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নতুন দানবাক্স স্থাপনের পর প্রথমবার প্রকাশ্যে গণনা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে দানের অর্থ সোনালী ব্যাংকে মাজারের নামে খোলা হিসাবে রাখার কথা জানানো হয়।
এর পেছনে মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে একটি কমিটিও গঠন করা হয়।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত চার দফার হিসাব একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—দান এখানে সামান্য কোনো অর্থের বিষয় নয়।
চার দফায় সোয়া দুই কোটি টাকার বেশি নগদ পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে স্বর্ণ, রুপা, বৈদেশিক মুদ্রা ও পশু রয়েছে। আর এই হিসাব মাত্র ২০২৬ সালের ২২ জুন থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকাশ্যে গণনা করা অর্থের।
তাই মানুষের স্বাভাবিক প্রশ্ন হতে পারে—এর আগে বছরের পর বছর যে দান এসেছে, তার পূর্ণ হিসাব কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে পুরোনো হিসাবও প্রকাশ্যে আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রতি মাস বা প্রতি দফার আয়-ব্যয়, ব্যাংক জমা, ব্যয় এবং অবশিষ্ট অর্থের হিসাব প্রকাশ করা হলে দাতাদের আস্থাও আরও শক্তিশালী হতে পারে।