ঈদের দিনে দেশে সড়ক থেকে চিরবিদায় নিলেন ২২ জন
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৩০ মে:
ঈদের আনন্দ, কোলাকুলি আর ঘরে ফেরার উচ্ছ্বাসের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন সড়কে ঝরে গেল ২২টি প্রাণ। মাত্র একদিনে ১২ জেলার সড়কে ঘটে একের পর এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। কোথাও বাসের চাপা, কোথাও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, কোথাও আবার বেপরোয়া গতির কারণে থেমে গেছে বহু স্বপ্নের পথচলা।
সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে গোপালগঞ্জে। বেদগ্রাম এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পিরোজপুরগামী দোলা পরিবহনের একটি বাস মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে একই পরিবারের তিনজনসহ মোট ছয়জন নিহত হন। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যায় আট বছরের এক শিশুও। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাসটির অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালানোই এই মৃত্যুর কারণ।

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী থানাধীন ভেল্লাপাড়া ব্রিজ এলাকায় ঈগল পরিবহনের একটি বাস উল্টো পথে এসে একটি লেগুনার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে তিনজন নিহত হন এবং আহত হন অন্তত ২০ জন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলছিল।
দিনাজপুরে বৃষ্টিভেজা সড়কে ট্রাকের ধাক্কায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। গুরুতর আহত চারজনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে দুই শিশুর মৃত্যু হয়।
পটুয়াখালীর গলাচিপায় মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত হন দুই তরুণ— তামিম হাওলাদার (২০) ও ফয়সাল (১৯)। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুজন।
ফরিদপুরে পদ্মা সেতু দেখতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরা হয়নি দুই বন্ধুর। ফরিদপুর-ভাঙ্গা মহাসড়কে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন রাজন শেখ (১৮) ও ইব্রাহিম ফকির (১৭)।
টাঙ্গাইলে দুই পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান কলেজ শিক্ষার্থী কানন আহমেদ (১৭) এবং দর্জি ব্যবসায়ী সফিকুল ইসলাম সফি (৪৭)। সখীপুরে দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে কানন ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
নাটোরে পৃথক পাঁচটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন তিনজন। তাদের মধ্যে রয়েছেন নাদিম ইসলাম রুবেল (২৫), ফারুক হোসেন (২০) ও রাজমিস্ত্রি আব্দুল কাদের (৩১)। আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ হারান তিন সন্তানের জননী মালেকা বেগম (৪৫)। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক যুবক মোটরসাইকেল থেকে পড়ে বাসচাপায় নিহত হন।
নড়াইলের লোহাগড়ায় যাত্রীবাহী বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত হন সাব্বির গাজী (১৮)। আর মাদারীপুরের শিবচরে চলন্ত বাস থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারান সাত্তার হাওলাদার (৫৫)।
ঈদের দিনে এসব মৃত্যুর ঘটনায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কোথাও সন্তানের লাশ জড়িয়ে মায়ের আহাজারি, কোথাও বন্ধুর নিথর দেহ দেখে বাকরুদ্ধ স্বজনরা। যে মানুষগুলো সকালে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছিলেন, সন্ধ্যার আগেই তারা পরিণত হয়েছেন লাশে।
প্রতি বছর ঈদের সময় বাড়তি যানবাহন, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে সড়কগুলো যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। অথচ দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও ঈদের আনন্দ কেড়ে নিল রক্তাক্ত মহাসড়ক।