টিকা নিয়ে ‘বিভ্রান্তিকর, বিপজ্জনক ও চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বক্তব্য দিচ্ছেন রিফর্ম ইউকের নেতারা: ব্রিটিশ স্বাস্থ্য মন্ত্রী
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক নিউজ, লন্ডন, ২৯ ডিসেম্বর:
যুক্তরাজ্যজুড়ে রিফর্ম ইউকে দলের এক-তৃতীয়াংশ কাউন্সিল নেতা টিকা নিয়ে সংশয়ী ও সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন বলে উঠে এসেছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রী।
রিফর্ম ইউকে যেসব ১২টি কাউন্সিলে ক্ষমতায় আছে বা সবচেয়ে বড় দল, তার মধ্যে চারটি—কেন্ট, ওরচেস্টারশায়ার, ওয়ারউইকশায়ার ও ডারহাম—এই কাউন্সিলগুলোর নেতারা প্রকাশ্যে টিকাবিরোধী মন্তব্য করেছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রী জুবির আহমেদ, যিনি একজন এনএইচএস ট্রান্সপ্লান্ট ও ভাসকুলার সার্জন, এসব মন্তব্যকে “বিপজ্জনক ও সম্পূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানহীন” বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, রাজনীতিকরা যখন টিকা নিয়ে সন্দেহ ছড়ান, তখন তারা শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে মারাত্মক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেন।
এই বিতর্কের সূত্রপাত আরও জোরালো হয় গত সেপ্টেম্বর রিফর্ম ইউকের সম্মেলনে। সেখানে বিতর্কিত চিকিৎসক ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ আসিম মালহোত্রা দাবি করেন, কোভিড টিকা রাজপরিবারে ক্যানসারের কারণ হয়েছে—যা সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।
মালহোত্রা বর্তমানে টিকা-সংশয়ী মার্কিন স্বাস্থ্য সচিব রবার্ট এফ কেনেডির একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই কোভিড টিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন এবং দাবি করে আসছেন যে ভাইরাসের চেয়েও টিকা বেশি ক্ষতিকর—যা বারবার তথ্য যাচাইকারীদের দ্বারা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
রিফর্ম ইউকের চেয়ারম্যান ডেভিড বুল বলেন, মালহোত্রা তার সঙ্গে মিলে দলের স্বাস্থ্যনীতি তৈরিতে কাজ করেছেন। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, টিকা নিয়ে সংশয় শুধু এক ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো দলজুড়েই বিস্তৃত। দলের নেতা নাইজেল ফারাজ, তার ডেপুটি রিচার্ড টাইস এবং কনজারভেটিভ দল থেকে আসা ড্যানি ক্রুগার—তিনজনই বিভিন্ন সময় টিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
রিফর্ম ইউকের প্রথম কাউন্সিল নেতা ও কেন্ট কাউন্টি কাউন্সিলের প্রধান লিন্ডেন কেমকারান গত সেপ্টেম্বরে দাবি করেন, কোভিড টিকার সঙ্গে ক্যানসারের কোনো সম্পর্ক আছে কি না—তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত হওয়া উচিত, যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণ নেই।
টাইমস রেডিওকে তিনি বলেন, “যেসব বিষয় অন্যরা চুপ করিয়ে দিতে চায়, সেগুলো নিয়ে বিতর্ক করতে রিফর্ম ভয় পায় না। এই বিষয়টি অবশ্যই আলোচনা হওয়া উচিত।”
ওরচেস্টারশায়ারের কাউন্সিল নেতা জো মনক নভেম্বরের এক বৈঠকে বলেন, রোগ প্রতিরোধে টিকার ভূমিকা তিনি স্বীকার করেন, তবে “কিছু টিকাদান বিষয়ে এখনও তিনি সিদ্ধান্তহীন”—যা বিরোধী কাউন্সিলরদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ওয়ারউইকশায়ার কাউন্সিলের নেতা জর্জ ফিঞ্চ আগস্টে এলবিসি রেডিওতে সর্বশেষ চিকেনপক্স টিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, “চিকেনপক্স পার্টি দিয়ে বিষয়টা সেরে ফেলা যায়” এবং ভাইরাসটিকে তিনি “জীবনেরই অংশ” হিসেবে উল্লেখ করেন।
সরকারি মন্ত্রীরা আশা করছেন, শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে চিকেনপক্স টিকা যুক্ত হলে গুরুতর জটিলতা থেকে অনেক শিশুকে রক্ষা করা যাবে এবং অসুস্থ সন্তানের কারণে অভিভাবকদের কাজ থেকে ছুটি নেওয়ার প্রয়োজনও কমবে।
ডারহাম কাউন্টি কাউন্সিলের রিফর্ম নেতা অ্যান্ড্রু হাসব্যান্ড ২০২৩ সালের অক্টোবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (বর্তমানে মুছে ফেলা) এক পোস্টে টিকাকে “মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত সব অপরাধের মতোই ভয়াবহ” বলে মন্তব্য করেন।
এই অবস্থায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, রাজনৈতিক পর্যায় থেকে টিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করতে পারে।