উদ্বিগ্ন ব্রিটিশ–বাংলাদেশি কমিউনিটি, ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন
ব্রিটিশ হতে হলে এখানে জন্ম নিতে হবে—এই ধারণা বাড়ছে ব্রিটেনে
ভয়েস অব পিপল নিউজ, ৩০ ডিসেম্বর:
যুক্তরাজ্যে এমন মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যারা মনে করেন—ব্রিটিশ হতে হলে অবশ্যই এই দেশেই জন্ম নিতে হবে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এই ধারণা পোষণকারীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই প্রবণতা ব্রিটিশ–বাংলাদেশিসহ অভিবাসী ও সংখ্যালঘু কমিউনিটির মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি রিসার্চ (IPPR)-এর জন্য করা ইউগভ জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে ৩৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন—যুক্তরাজ্যে জন্ম না নিলে কেউ প্রকৃত অর্থে ব্রিটিশ হতে পারে না। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ১৯ শতাংশ। যদিও এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিশ্বাস করেন, ব্রিটিশ পরিচয় যৌথ মূল্যবোধ, আইন মানা ও নাগরিক দায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তবু জাতি, জন্মস্থান ও বংশপরিচয়কে ব্রিটিশত্বের মূল মানদণ্ড হিসেবে দেখার প্রবণতা স্পষ্টভাবে বাড়ছে।
গবেষণায় সবচেয়ে কট্টর মনোভাব দেখা গেছে নাইজেল ফারাজের দল রিফর্ম ইউকে–এর সমর্থকদের মধ্যে। তাদের বড় একটি অংশ মনে করেন, ব্রিটিশ বংশ ছাড়া কেউ প্রকৃত ব্রিটিশ হতে পারে না। এমনকি কিছু সমর্থক শ্বেতাঙ্গ হওয়াকেও ভালো ব্রিটিশ নাগরিক হওয়ার শর্ত হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ধারণা ব্রিটেনের বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ–বাংলাদেশি কমিউনিটিতে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। টাওয়ার হ্যামলেটসের একজন কমিউনিটি সংগঠক বলেন,
“আমরা এখানে জন্ম না নিলেও আমাদের জীবন, শ্রম আর ভবিষ্যৎ এই দেশের সঙ্গেই জড়িয়ে। কর দিচ্ছি, এনএইচএসে কাজ করছি, সন্তানদের এখানেই বড় করছি—তবু যদি আমাদের ব্রিটিশত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়, সেটা খুবই বেদনাদায়ক।”
একজন তরুণ ব্রিটিশ–বাংলাদেশি পেশাজীবী বলেন,
“আমাদের অনেকেই ব্রিটেনে জন্মেছি, তবু ত্বকের রঙ বা নামের কারণে আমাদের বারবার প্রমাণ দিতে হয়—আমরা এই দেশেরই মানুষ। এই ধরনের জরিপ দেখায়, সেই চাপ আরও বাড়তে পারে।”
তবে আশার দিকও আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, রিফর্ম ছাড়া কনজারভেটিভসহ অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দলের অধিকাংশ সমর্থকই এখনো মনে করেন, ব্রিটেন একটি নাগরিক রাষ্ট্র—যেখানে ভালো নাগরিক হওয়ার মানে আইন মানা, পরিশ্রম করা, সন্তানদের নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখা। ত্বকের রঙ বা বংশপরিচয়কে গুরুত্ব দেন খুব অল্প মানুষই।
কমিউনিটির প্রবীণ এক নেতা বলেন,
“এই দেশ আমাদের শ্রমে দাঁড়িয়েছে। ব্রিটিশত্ব কোনো রক্তের বিষয় নয়—এটা দায়িত্ব, মূল্যবোধ আর সহাবস্থানের বিষয়। এই কথাটা নতুন প্রজন্মকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে হবে।”
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, কট্টর ডানপন্থী রাজনীতি ও অনলাইনে ছড়ানো বিভাজনমূলক বয়ান ধীরে ধীরে জনমতকে প্রভাবিত করছে। ব্রিটিশ–বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতাদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সমান নাগরিক অধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্রিটিশ পরিচয় এবং বহুজাতিক সমাজের পক্ষে আরও সংগঠিত ও দৃঢ় কণ্ঠ প্রয়োজন।