নির্বাচন ঘিরে দেশে ক্রমশ সক্রিয় হচ্ছে সন্ত্রাসী চক্র: বাড়ছে ভয় ও অনিশ্চয়তা

নির্বাচন ঘিরে দেশে ক্রমশ সক্রিয় হচ্ছে সন্ত্রাসী চক্র: বাড়ছে ভয় ও অনিশ্চয়তা

ঢাকা প্রতিনিধি, ৩০ জানুয়ারি—নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের অপরাধজগত যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। চোখে না পড়ে, নিঃশব্দভাবে, কিন্তু মারাত্মকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছে সন্ত্রাসী চক্র। পুরোনো মস্তানদের স্থান এখন নিয়েছে অচেনা, ছোট ছোট সেল—একটি জটিল শ্যাডো নেটওয়ার্ক, যা শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী ও দক্ষিণখান এলাকায় পুরোনো সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের গ্যাংগুলো যুক্ত হয়ে মাঠপর্যায়ে টার্গেটেড অপারেশন চালাচ্ছে। তারা সরাসরি সামনাসামনি আসে না, বরং মধ্যস্থতাকারী, কিশোর গ্যাং ও পেশাদার হিটম্যান ব্যবহার করে টার্গেট কিলিং, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি চালাচ্ছে।

পুলিশের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, “আগে নামকরা মস্তানদের দেখা যেত। এখন শ্যাডো নেটওয়ার্ক কাজ করছে—ছোট ছোট সেল, সীমিত যোগাযোগ, কিন্তু আঘাত মারাত্মক।”

বিদেশি কমান্ড, স্থানীয় ঘাতক

শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনেকেই এখন দেশে নেই। ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে এনক্রিপটেড অ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশনা দিচ্ছে তারা। মাঠপর্যায়ের অপরাধীরা তাদের পুরো পরিকল্পনা জানে না। এই বিভাজিত কাঠামোই এখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের মূল শক্তি।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ইতোমধ্যেই তিন শতাধিক দাগি অপরাধীর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এখনও কোনো তালিকা প্রকাশ করেনি। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ডিএমপির কর্মকর্তারা বলছেন, তালিকার চেয়ে টার্গেটেড অপারেশন ও রিস্ক ম্যাপ তৈরি করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

অস্ত্রের আধুনিকায়ন, যুবসমাজের ঝুঁকিপূর্ণতা

সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া অস্ত্রে দেখা গেছে বিদেশি পিস্তল, সাইলেন্সার, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ও উন্নত দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র। অপরাধে জড়িত তরুণদের বয়স ১৮–২৫ বছর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসী জীবন প্রদর্শন, দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভ এবং রাজনৈতিক আশ্রয়—এই তিনটি বিষয় নবীন যুবসমাজকে অপরাধের পথে ঠেলে দিচ্ছে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, “আন্ডারওয়ার্ল্ড এখন বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি অর্থ, রাজনীতি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সংগঠিত ব্যবস্থা। এটিকে ভাঙতে হলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।”

নির্বাচনের ছায়া, সীমান্তে আগ্নেয়াস্ত্র

নির্বাচনের ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সন্ত্রাসী চক্রের তৎপরতা বেড়ে যাচ্ছে। প্রভাব বিস্তার, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, অবৈধ অর্থ সংগ্রহ—সবকিছুর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে চক্রগুলোকে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমপক্ষে ১৮টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করছে। হুন্ডি ও অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রবাহের মাধ্যমে তহবিল জোগান হচ্ছে। এই অর্থ দিয়ে কেনা হচ্ছে অস্ত্র, ভাড়া করা হচ্ছে ক্যাডার, দখল নেওয়া হচ্ছে এলাকা।

অদৃশ্য যুদ্ধ

ঢাকার এই যুদ্ধ প্রকাশ্যে নয়। কোনো মিছিল নেই, কোনো স্লোগান নেই। আছে শুধুই নিঃশব্দ প্রস্তুতি। ঘটনা ঘটার পর সূত্র পাওয়া যায়, ঘটার আগে নয়। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন,
“নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে নেটওয়ার্ক ভাঙার চেষ্টা করছি।”

নীরব এই শহরের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটাই ভয়ংকর—অপরাধজগৎ কি আমাদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে?