ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১১৩ ।। ভারতের উত্তরে মিন্তদু বাঁধ: সিলেটের জন্য হবে মরণফাঁদ
উৎসর্গ
“সিলেটের নদী ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের প্রতি”

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘালয় রাজ্যের জৈন্তিয়া পাহাড়ে দ্রুত এগিয়ে চলা মিন্তদু নদভিত্তিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়—এটি বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের জন্য এক গভীর আশঙ্কার নাম। যে নদটি পাহাড় পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে সারি গোয়াইন নদ নামে প্রবাহিত হয়, সেটিই আজ একাধিক বাঁধের জালে আটকে পড়ার মুখে।
প্রশ্নটা সহজ—উজানে যদি নদীকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়, তাহলে ভাটিতে কি তার প্রাণ বেঁচে থাকে?

এক নদী, বহু বাঁধ: বিপদের সূত্রপাত
ভারতের মিন্তদু নদে ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প চালু রয়েছে, যার নাম “স্টেজ ওয়ান”। এর পরপরই “স্টেজ টু” এবং আরও উজানে নতুন প্রকল্প—সব মিলিয়ে একের পর এক বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে। একই সঙ্গে পাশের কিনশি নদেও একাধিক বড় প্রকল্পের প্রস্তুতি চলছে, যা বাংলাদেশে এসে যাদুকাটা নদ হিসেবে পরিচিত।
এই ধারাবাহিক বাঁধগুলো ‘রান অব দ্য রিভার’ প্রকল্প হলেও বাস্তবে এগুলো নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বারবার ঘুরিয়ে দিচ্ছে। ফলে নদীর মূল খাতের দীর্ঘ অংশ প্রায় শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

সিলেটের জন্য কেন ‘মরণফাঁদ’?
১. শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব
বাঁধগুলো পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করবে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে সিলেট অঞ্চলের নদীগুলোতে পানি কমে যাবে। কৃষি, পানীয় জল ও জীববৈচিত্র্য—সবকিছুই এর সরাসরি শিকার হবে।
২. হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি
অতিবৃষ্টি হলে বাঁধ থেকে হঠাৎ পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে আকস্মিকভাবে। সুনামগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলে যে হড়কা বানের ভয়াবহতা আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি, তা আরও তীব্র হতে পারে।
৩. নদীর প্রাণহানি ও মাছের বিলুপ্তি
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকলে মাছের প্রজনন ও চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা—ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এই অঞ্চলে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।
৪. জীবিকা হারানোর আশঙ্কা
সারি গোয়াইন ও যাদুকাটা নদকেন্দ্রিক হাজারো মানুষ বালু-পাথর উত্তোলন ও মাছ ধরার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। নদী শুকিয়ে গেলে এই অর্থনীতি ভেঙে পড়বে।
৫. পরিবেশগত বিপর্যয়
নদীর প্রবাহের পরিবর্তন, পানির অম্লতা বৃদ্ধি, বনাঞ্চল ধ্বংস—সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চলের পরিবেশ ভারসাম্য নষ্ট হবে। নদীভাঙন, ভূমিধস এবং ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকিও বাড়বে।
অতীতের অভিজ্ঞতা: আমরা কি আবারও ভুল করছি?
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ফারাক্কা ব্যারাজ–এর প্রভাব ভোগ করেছে। গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে গিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি, নদী ও জীববৈচিত্র্যে যে ক্ষতি হয়েছে, তা আজও পূরণ হয়নি। একইভাবে তিস্তা নদ নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা আমাদের দেখিয়েছে—উজানের একতরফা সিদ্ধান্ত ভাটির জীবনকে বিপন্ন করে।
মিন্তদু প্রকল্প সেই ইতিহাসেরই নতুন অধ্যায় হতে যাচ্ছে।
তাহলে বাংলাদেশ সরকারের কী করা উচিত?
বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়—এটি কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
- যৌথ পরিবেশগত মূল্যায়ন (EIA) দাবি করতে হবে
- যৌথ নদী কমিশনকে কার্যকর করতে হবে
- আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিষয়টি তুলতে হবে
- বন্যা পূর্বাভাস ও পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে।

প্রবাসীদের যা করা দরকার :
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা এই ইস্যুকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলতে পারেন—
- আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় লেখা ও প্রচারণা
- পরিবেশবাদী সংগঠনের সঙ্গে কাজ
- নীতিনির্ধারকদের ওপর লবিং
বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে বসবাসকারীরা এই বিষয়ে জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
দেশের জনগণের এতে কি করার আছে?
- নদী ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়ানো
- তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও আন্দোলন গড়ে তোলা
- স্থানীয় পর্যায়ে নদী রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া

মিন্তদু নদে নির্মিত প্রতিটি বাঁধ হয়তো ভারতের জন্য বিদ্যুতের উৎস, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তা হতে পারে জীবনের সংকট। সিলেটের নদীগুলো যদি প্রাণ হারায়, তাহলে শুধু একটি অঞ্চল নয়—একটি সংস্কৃতি, একটি অর্থনীতি, একটি জীবনব্যবস্থা ধ্বংস হবে।
প্রশ্নটা এখনই—আমরা কি আগেভাগে প্রস্তুতি নেব, নাকি আবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখব?