কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮৫ ।। ইরান সংকট: টিকে থাকা, প্রতিশোধ না পুনর্গঠন?
উৎসর্গ
মধ্যপ্রাচ্যের সকল সাধারণ মানুষের প্রতি—
যাঁরা ক্ষমতার সংঘাতে সবচেয়ে বেশি মূল্য দেন

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আমরা প্রায়ই দেখি—যুদ্ধ শুরু করা সহজ, শেষ করা কঠিন; কিন্তু সবচেয়ে কঠিন হলো যুদ্ধের পরের বাস্তবতাকে সামলানো। সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি সমন্বিত হামলার পর ইরানকে ঘিরে যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, তা শুধু একটি সামরিক সংঘাত নয়; এটি রাষ্ট্র-টিকে থাকা বনাম রাষ্ট্র-পুনর্গঠনের এক গভীর দ্বন্দ্ব।
ধরা যাক, ইরান এই যুদ্ধ টিকে গেল। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—ইসলামিক প্রজাতন্ত্র কি আগের মতো থাকবে? ইতিহাস বলে, শাসনব্যবস্থা বড় আঘাতের পর হয় ভেঙে পড়ে, নয়তো বদলে যায়। স্থির থাকে না।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনীর মৃত্যু—কেবল একজন ব্যক্তির অনুপস্থিতি নয়; এটি চার দশকের ক্ষমতার ধারাবাহিকতার অবসান। ১৯৮৯ সাল থেকে তিনি শুধু রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না, বরং একটি আদর্শিক কাঠামোর প্রতীক ছিলেন। সেই প্রতীক সরিয়ে দিলে রাষ্ট্রযন্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যায় না, কিন্তু তার অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নড়ে ওঠে।
এখানেই প্রথম প্রশ্ন: ইরানের লক্ষ্য কী? জয় নয়, টিকে থাকা। তারা জানে, প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই তাদের কৌশল হবে সংঘাতের ব্যয় ছড়িয়ে দেওয়া—ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, প্রক্সি চাপ, আঞ্চলিক অস্থিরতা। এটি এক ধরনের “অসম যুদ্ধ”, যেখানে শক্তির ভারসাম্য নয়, সহ্যশক্তির ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি এই আঘাতকে সীমিত প্রতিশোধ হিসেবে নয়, বরং একটি সিদ্ধান্তমূলক অধ্যায় হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন। তাঁর রাজনৈতিক ভাষ্য স্পষ্ট—দীর্ঘদিনের এক প্রতিপক্ষকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। কিন্তু সামরিক সাফল্য আর কৌশলগত সাফল্য এক জিনিস নয়। প্রশ্ন হলো: এরপর কী?
ইরানে শাসন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে ওয়াশিংটন এক ধরনের নৈতিক উচ্চভূমি দাবি করছে—“ইরানি জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ ঠিক করুক।” কিন্তু বাইরের সামরিক চাপের ভেতর দাঁড়িয়ে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ গণ-আন্দোলন জন্ম নেয় কি? ইতিহাসে এর উদাহরণ সীমিত, আর ফলাফল প্রায়ই অনিশ্চিত। বরং বাইরের আঘাত অনেক সময় জাতীয়তাবাদী আবেগকে উসকে দিয়ে বিদ্যমান শাসনকেই সাময়িকভাবে শক্ত করে তোলে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনঞ্জামিন নেতানিয়াহু-এর লক্ষ্য কিছুটা আলাদা। তাঁর প্রধান উদ্বেগ নিরাপত্তা—ইরানকে এমন অবস্থায় রাখা, যাতে সে দীর্ঘ সময় অভ্যন্তরীণভাবে ব্যস্ত থাকে এবং কৌশলগতভাবে দুর্বল হয়। স্থায়ী পতন না হলেও, স্থায়ী ব্যস্ততা ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত সাফল্য।
এই সংঘাতে তিন পক্ষের লক্ষ্য তাই ভিন্ন: ইরান টিকে থাকতে চায়; যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্তমূলক ফল চায়; ইসরায়েল দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা চায়। এই তিনটি লক্ষ্য এক সরলরেখায় মেলে না। আর সেখানেই অনিশ্চয়তার জন্ম।
খামেনির অনুপস্থিতিতে ক্ষমতার প্রশ্নটি সবচেয়ে স্পর্শকাতর। সংবিধান অনুযায়ী উত্তরসূরি নির্ধারণের পথ আছে, কিন্তু বাস্তবে প্রভাবশালী শক্তি হবে বিপ্লবী গার্ড ও নিরাপত্তা কাঠামো। তারা কি একটি সমষ্টিগত নেতৃত্ব গড়ে তুলবে? নাকি ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়বে? যদি ভাঙন শুরু হয়, বাইরের সামরিক চাপ সেটিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। আবার একই চাপ অভ্যন্তরীণ ঐক্যও জোরদার করতে পারে। ফল নির্ভর করবে ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়ার ওপর।
আরেকটি মাত্রা ভুলে গেলে চলবে না—অর্থনীতি। উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা মানে জ্বালানি বাজারে চাপ, বৈশ্বিক বাণিজ্যপথে ঝুঁকি। হরমুজ প্রণালীতে সামান্য উত্তেজনাই বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় উত্থান ঘটাতে পারে। অর্থাৎ এই সংঘাত শুধু তেহরান, তেল আবিব বা ওয়াশিংটনের সীমায় আবদ্ধ নয়; এর ঢেউ পৌঁছাবে লন্ডন, ঢাকা কিংবা টরন্টোতেও।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই সামরিক নয়, রাজনৈতিক: যুদ্ধ-পরবর্তী রূপরেখা কী? যদি ওয়াশিংটনের কাছে স্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকে—কে, কীভাবে, কোন কাঠামোয় ইরান পরিচালনা করবে—তাহলে সামরিক সাফল্য কৌশলগত শূন্যতায় রূপ নিতে পারে। ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এখনো বিশ্বরাজনীতির স্মৃতিতে তাজা।

পৃথিবীর প্রাচীনতম পারস্য সভ্যতার দেশ ইরান হয়তো টিকে যাবে। কারণ ওরা বিগত ৪ হাজার বছর ধরে টিকে আছে। আলেকজান্ডার, হালাকু খানও এ দেশ দখল করতে পারেনি। কিন্তু টিকে থাকা আর অপরিবর্তিত থাকা এক নয়। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র যদি রূপান্তরিত হয়—হোক তা আরও কঠোর নিরাপত্তাকেন্দ্রিক শাসনে, অথবা ধীরে ধীরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে—তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলাবে।
এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যায় শুধু একটি কথা: যুদ্ধের প্রথম আঘাত যতটা দৃশ্যমান, তার পরের নীরব পুনর্গঠন ততটাই গভীর। বন্দুকের শব্দ থামার পরই প্রকৃত রাজনীতি শুরু হয়। আর সেই রাজনীতিই নির্ধারণ করবে—এটি ছিল একটি সামরিক অধ্যায়, নাকি এক নতুন যুগের সূচনা। দেখা যাক, সময়ই বলে দেবে।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১ মার্চ, ২০২৬