‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৫৫ ।। বাড়ি ফিরে ফুল আঁকব
।। বাড়ি ফিরে ফুল আঁকব ।।
উৎসর্গ
অকালে প্রাণ হারানো নিষ্পাপ শিশুদের স্মৃতির প্রতি
এবং তাঁদের শোকে পাথর হয়ে যাওয়া মা-বাবা, ভাইবোন ও স্বজনদের প্রতি।

মা, আমি বাড়ি ফিরে একটা লাল ফুল আঁকব
—মা, আমি বাড়ি ফিরে একটা লাল ফুল আঁকব। অনেক বড় ফুল। তোমার জন্য।
কথাটা বলেই মায়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসে আট বছরের ঐশী দাস। চট্টগ্রামের উত্তর কাট্টলী বাংলাবাজারের ছোট্ট বাড়িটিতে মেয়ের হাসি যেন প্রতিদিনের আলো। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া ঐশী ছবি আঁকতে ভালোবাসে। তার স্কুলের খাতায় ফুল, পাখি আর প্রজাপতির ছবি ছড়িয়ে থাকে।
মা লিপি দাস মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
—আগে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফির মা। তারপর যত খুশি ছবি আঁকবি।
ঐশীর বাবা লিটন দাস কুয়েতে থাকেন। বড় বোন রুহি দাস সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট্ট ঐশী পরিবারের সবার আদরের। চাচা মিঠুনন দাসও তাকে খুব ভালোবাসেন। সে সবচেয়ে আদরের ভাতিজি। তিনিও একদম ভেঙে পড়েছেন ঐশিীর অসুখে।
কিন্তু অসুখ তো কখনো বলেকয়ে আসে না।
একদিন ঐশীর জ্বর শুরু হয়। শরীরের তাপমাত্রা ১০৩ ডিগ্রি। মা প্রথমে ভেবেছিলেন সাধারণ জ্বর। কিন্তু জ্বর না কমায় মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে যান। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত করেন।
চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় ফিরলেও ঐশীর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। শুরু হয় বমি। দ্রুত তাকে নেওয়া হয় নগরের জিইসি মোড় এলাকার রয়েল হাসপাতালে। সেখানে দুই দিন চিকিৎসার পর অবস্থার আরও অবনতি হয়। আইসিইউ শয্যা না থাকায় চিকিৎসকদের পরামর্শে নেওয়া হয় বায়েজিদ এলাকার সাজিনাস হাসপাতালে। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয় তাকে। দেওয়া হয় লাইফ সাপোর্ট।
মা হাসপাতালের বিছানার পাশে বসে মেয়ের হাত ধরে থাকেন। বারবার কপালে হাত রাখেন। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে কত প্রার্থনা করেন!
ঐশী কি আর একবার চোখ খুলবে?
ঐশী কি আর একবার মাকে ডাকবে?
কিন্তু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, ঐশী আর নেই।
খবরটি শুনে লিপি দাসের পৃথিবী যেন থেমে যায়। যে মেয়েকে নিয়ে কত স্বপ্ন, যে মেয়ের জন্য প্রতিদিন রান্না হয়, যে মেয়ের স্কুলে যাওয়ার জন্য সকালে তাড়া দিতে হয়, সেই মেয়েটিই আজ আর ফিরবে না!
কুয়েতে খবর পৌঁছানোর পর বাবা লিটন দাস দেশে ফেরার জন্য ছুটে আসেন। শুক্রবার সকালে বাড়িতে পৌঁছে মেয়ের মরদেহ দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। চাচা মিটন দাসের মুখেও কোনো সান্ত্বনার ভাষা নেই। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় উত্তর কাট্টলীর বাড়িটি ভারী হয়ে ওঠে।
সেদিন সকাল সাড়ে দশটার দিকে উত্তর কাট্টলী সনদ দত্ত মহাশ্মশানে ঐশীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
একটি পরিবারের ছোট্ট পৃথিবী ভেঙে যায়।
কিন্তু ঐশীর গল্পটি শুধু একটি পরিবারের কান্নার গল্প নয়। এটি আমাদের সবার জন্য সতর্কবার্তা।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের সংক্রমণও শিশুদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। জটিল হলে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
অথচ সময়মতো টিকা নেওয়ার মাধ্যমে হাম প্রতিরোধ করা সম্ভব। শিশুর নির্ধারিত এমআর বা এমএমআর টিকার দুই ডোজ নিশ্চিত করা জরুরি। টিকার কার্ড পরীক্ষা করুন। কোনো ডোজ বাদ পড়লে স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
একটি টিকা হয়তো একটি শিশুকে ভয়ংকর অসুখ থেকে বাঁচাতে পারে। একটি সচেতন সিদ্ধান্ত হয়তো একটি মায়ের বুক খালি হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
ঐশীর ঘরে হয়তো এখনো তার আঁকার খাতা পড়ে আছে। হয়তো কোনো পাতায় অর্ধেক আঁকা একটি ফুল। লাল রং দিয়ে যার পাপড়িগুলো পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় ছিল।
মা লিপি দাস কি কখনো সেই খাতাটি খুলে দেখবেন? মেয়ের আঁকা অসমাপ্ত ফুলের দিকে তাকিয়ে কি আবার শুনতে পাবেন সেই পরিচিত কণ্ঠ?
—মা, বাড়ি ফিরে ফুল আঁকব।
ঐশী আর বাড়ি ফিরবে না। তার আঁকা ফুলটিও আর সম্পূর্ণ হবে না।
কিন্তু অন্য কোনো বাড়িতে যেন এমন অসমাপ্ত ছবি পড়ে না থাকে। অন্য কোনো মাকে যেন সন্তানের শেষ প্রতিশ্রুতি মনে করে সারাজীবন কাঁদতে না হয়।
শিশুর জীবন অমূল্য। ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষা, হামের টিকা এবং সময়মতো চিকিৎসা—কোনোটিই অবহেলা করার সুযোগ নেই। একটি শিশুর হাসি বাঁচাতে একটি পরিবার, একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন।
লন্ডন, ১ নভেম্বর ২০২৬