আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার পক্ষে আপত্তিপত্র—বিচার নিয়ে নতুন বিতর্কের আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার পক্ষে আপত্তিপত্র—বিচার নিয়ে নতুন বিতর্কের আশঙ্কা

ঢাকা, ২ এপ্রিল: বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে আন্তর্জাতিক আইন সংস্থা Kingsley Napley LLP আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) গত ৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখে একটি আনুষ্ঠানিক আপত্তিপত্র জমা দিয়েছে। চিঠিতে চলমান বিচার কার্যক্রমকে অবৈধ, পক্ষপাতদুষ্ট এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করে রায় বাতিল এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পুনর্বিচারের দাবি জানানো হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বিচার (trial in absentia) পরিচালনা করে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই আপত্তিপত্র দাখিল করা হয়েছে। এতে বলা হয়, এ ধরনের বিচার আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচার নীতিমালার পরিপন্থী এবং অভিযুক্তের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

চিঠিতে বিচারবিভাগীয় স্বাধীনতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিচারকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং বিচারকদের পূর্বনির্ধারিত মন্তব্যের অভিযোগ উল্লেখ করে বলা হয়, এসব বিষয় বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এছাড়া প্রসিকিউশন পক্ষের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, একপাক্ষিক মামলা পরিচালনা এবং প্রসিকিউশন টিমে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে আপত্তিপত্রে।

ন্যায্য বিচার নিশ্চিত না হওয়ার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, অভিযোগপত্র যথাযথভাবে সরবরাহ করা হয়নি, পছন্দমতো আইনজীবী নিয়োগে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি ICCPR-এর ১৪ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।

এছাড়া ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল মূলত ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য প্রণীত—এমন যুক্তি তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ঘটনাবলীর বিচার এ আইনের আওতায় আনা আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং পূর্বপ্রযোজ্যতার নীতির পরিপন্থী।

আপত্তিপত্রে পাঁচটি প্রধান দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় ও সাজা বাতিল, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রক্রিয়া স্থগিত, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পুনর্বিচার, আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে এই বিচার চ্যালেঞ্জ করার অধিকার সংরক্ষণ।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সবমিলিয়ে, শেখ হাসিনার পক্ষে দাখিল করা এই আপত্তিপত্র দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলোচনার জন্ম দিতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এর জবাব

এদিকে, জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো চিঠি আদালত অবমাননাকর বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। আজ বৃহস্পতিবার (২এপ্রিল) সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির পক্ষে লন্ডন থেকে ল ফার্ম দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিঠি পাঠানোর আইনে কোনো সুযোগ নেই। ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমকে বিতর্কিত করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। 

চিফ প্রসিকিউটর জানান, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে আসামিকে সশরীরে হাজির হয়ে আপিল করতে হবে। আসামি অনুপস্থিত থেকে কোনো ল ফার্মের মাধ্যমে চিঠি পাঠানোর সুযোগ নেই।