মিসাইল আতঙ্কে ইসরাইল: দেশ ছাড়ছেন দক্ষ নাগরিকরা
বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ২ এপ্রিল:
নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গড়ে ওঠা ইসরাইল রাষ্ট্র আজ যেন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। গাজা যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই নতুন করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা দেশটির ভেতরে তৈরি করেছে তীব্র আতঙ্ক। ফলে নাগরিক জীবনে নেমে এসেছে অস্থিরতা, আর সেই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন—দেশ ছাড়ার হিড়িক।
ইসরাইলি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়ে বহু ইসরাইলি নাগরিক ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে মিসরের সীমান্তবর্তী তাবা শহর এখন ইসরাইলিদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ‘পালানোর করিডোর’-এ পরিণত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে প্রথম হামলার পর থেকেই দেশ ছাড়ার প্রবণতা চোখে পড়ার মতো বেড়ে গেছে।
সীমান্ত পার হয়ে মিসরের সিনাই অঞ্চলে আশ্রয় নিচ্ছেন অনেকে। যদিও ঠিক কতজন দেশ ছেড়েছেন তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই, তবে পর্যবেক্ষকদের ধারণা—তাবা হয়ে যাতায়াতকারীদের বড় একটি অংশই ইসরাইলি নাগরিক। প্রতিদিন প্রায় ১৫টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে, যার অধিকাংশই পূর্ণ থাকছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে এই পালানোর পথও সহজ নয়। সীমান্ত পারাপারের খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আগে যেখানে ব্যক্তিপ্রতি ফি ছিল ৬০ ডলার, এখন তা বেড়ে ১২০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যানবাহনের ক্ষেত্রেও খরচ পাঁচগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ সিনাইয়ের হোটেলগুলোতেও ইসরাইলিদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে নিরাপত্তার খোঁজে পালাতে গিয়ে অর্থনৈতিক চাপেও পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
অন্যদিকে, যারা দেশ ছাড়তে পারছেন না, তারা ভেতরেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন। দক্ষিণের মরুভূমি শহর মিৎসপে রামনে আশ্রয় নিয়েছেন হাজারো মানুষ। তুলনামূলক কম সাইরেন বাজায় শহরটিকে কিছুটা নিরাপদ মনে করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, প্রায় তিন হাজার নতুন মানুষ সেখানে আশ্রয় নিয়েছে, যা শহরের মোট জনসংখ্যার তুলনায় উল্লেখযোগ্য।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো—এই দেশত্যাগের ঢেউয়ে যোগ দিয়েছেন সমাজের উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী। চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক—এমনকি উচ্চ আয়ের পেশাজীবীরাও দেশ ছাড়ছেন। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্রায় এক লাখ মানুষ ইসরাইল ছেড়েছেন, অর্থাৎ বছরে গড়ে ৫০ হাজার।
বিশেষ করে চিকিৎসকদের দেশত্যাগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই দুই বছরে প্রায় ৯৫০ জন চিকিৎসক দেশ ছেড়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই অভিজ্ঞ ও ৪০ বছরের বেশি বয়সি। ফলে স্বাস্থ্য খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সাময়িক নিরাপত্তা সংকট নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন নাগরিকদের এভাবে দেশত্যাগ অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রের ভেতরের কাঠামোগত শক্তিই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এক সময় যে রাষ্ট্র নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ সেই রাষ্ট্রেই নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সবচেয়ে বড় বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। যুদ্ধের আগুন শুধু সীমান্তে নয়—এখন তা জ্বলছে মানুষের মনেও।