‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’
হঠাৎ থেমে গেল কলম, লন্ডনে না ফেরার দেশে তৌফিক ইমরোজ খালিদী
নিজস্ব প্রতিবেদক, ২ অক্টোবর :
বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার অন্যতম পরিচিত মুখ এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক তৌফিক ইমরোজ খালিদী লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যার দিকে লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যু বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিশেষ করে দেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিকাশে তার দীর্ঘদিনের ভূমিকা সাংবাদিকদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রিন্ট সাংবাদিকতা থেকে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের পথিকৃৎ
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতা জীবন ছিল প্রিন্ট, সম্প্রচার ও ডিজিটাল—তিন মাধ্যমেই বিস্তৃত। বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্রডশিট সংবাদপত্রে কাজ করার পর তিনি যুক্তরাজ্যের বিবিসিতে উপস্থাপক, প্রযোজক ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। লন্ডনে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়েই পরবর্তীতে তিনি দেশে ফিরে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলার কাজে যুক্ত হন।
২০০৬ সালে তার নেতৃত্বে বিডিনিউজ নতুন মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নামে নতুন আঙ্গিকে যাত্রা শুরু করে। সেই সময় বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ধারণা এখনও নতুন। প্রচলিত সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের বাইরে ইন্টারনেটভিত্তিক ২৪ ঘণ্টার সংবাদসেবা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিডিনিউজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরবর্তী সময়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে পরিণত হয়। সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি মোবাইলভিত্তিক সংবাদসেবা, ব্রেকিং নিউজ ও এসএমএস অ্যালার্টসহ বিভিন্ন নতুন ডিজিটাল উদ্যোগেও প্রতিষ্ঠানটি কাজ করেছে।
জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পুরস্কার
ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৭ সালে তৌফিক ইমরোজ খালিদী জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পুরস্কারে বিশেষ সম্মাননা লাভ করেন। জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী তার হাতে সম্মাননা তুলে দেন।
তখনকার এক প্রতিবেদনে তাকে বাংলাদেশের ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদ প্রকাশনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিডিনিউজের নেতৃত্বে তিনি প্রচলিত সংবাদব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন মিডিয়া বা ডিজিটাল সংবাদ ব্যবসার একটি ভিন্ন মডেল দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন।
সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে তার নিজস্ব দর্শন
তৌফিক ইমরোজ খালিদী সাংবাদিকতাকে শুধু সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখতেন না। ২০২৫ সালে বিডিনিউজে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারের শিরোনামেই তার একটি বহুল আলোচিত বক্তব্য উঠে আসে—“শাসন করা নয়, শাসকদের জবাবদিহিতায় আনাই সংবাদমাধ্যমের কাজ।”
বিডিনিউজের ২০২৪ সালের ১৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে পুনর্গঠন, নবায়ন ও নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তার বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।
লন্ডনের সঙ্গে ছিল দীর্ঘ পেশাগত সম্পর্ক
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লন্ডনের সঙ্গে যুক্ত। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ করার সময় তিনি যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ফিরে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের নেতৃত্ব দিলেও লন্ডনের সঙ্গে তার পেশাগত ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ বজায় ছিল।
তিনি তার ছেলের সঙ্গে দেখা করতে লন্ডনে এসেছিলেন এবং কয়েক দিনের মধ্যেই দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু আকস্মিক অসুস্থতার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ভয়েস অব পিপলের শোক
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে ভয়েস অব পিপল গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছে।
ভয়েস অব পিপলের সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা বিশেষ করে অনলাইন সাংবাদিকতার বিকাশে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একজন সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে তার দীর্ঘ কর্মজীবন বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ভয়েস অব পিপল লন্ডন টিম মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন, সহকর্মী ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাংবাদিকদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে।
আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।