কলিকালের কলধ্বনি ।। ৫৪ ।। সব এমপি প্রার্থী দরিদ্র, স্ত্রীরা ধনী : এ বৈপরীত্য কেমনে মানি?
কলিকালের কলধ্বনি ।। পর্ব ৫৪ ।।
সব এমপি প্রার্থী দরিদ্র, স্ত্রীরা ধনী : এ বৈপরীত্য কেমনে মানি?

আমাদের দেশে নির্বাচন এলে মজার মজার অদ্ভূত বেশকিছু ঘটনা বা আচরণ ঘটতে দেখা যায়। এই যেমন প্রার্থীদের হলফনামায় সম্পদের বিবরণ সংক্রান্ত ব্যাপারটি ধরা যাক। আসন্ন সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামা পড়লে দেখা যায় এক আশ্চর্য মিল। প্রায় সব এমপি প্রার্থীই নিজেদের দেখাচ্ছেন সীমিত আয়ের মানুষ হিসেবে। নগদ টাকা কয়েক লাখ, পেশা ব্যবসা বা চাকরি, আয়ও মাঝারি। অথচ একই কাগজে চোখ রাখলেই দেখা যায় তাঁদের স্ত্রীরা কোটিপতি। ব্যাংকে স্থায়ী আমানত, বিনিয়োগ, ভরি ভরি স্বর্ণ, কোথাও কোথাও কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্ত্রীরা পেশায় গৃহিণী, অর্থাৎ নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস নেই।
কেউ একজন প্রার্থীর স্ত্রী আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও এক/দুই/তিন কোটির বেশি অস্থাবর সম্পদের মালিক। কেউ কেউ আরও বেশি। কারো স্ত্রী শিক্ষক বা গৃহবধূ হলেও তাঁর সম্পদের পরিমাণ স্বামীর চেয়ে অনেক বেশি। কোথাও দেখা যায়, স্ত্রীর নামে চার কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ, অথচ প্রার্থী নিজেকে মধ্যবিত্তের সীমায় আটকে রেখেছেন। আবার স্বর্ণের হিসাব এমনভাবে দেওয়া হয়েছে, যেন বাজারদর বছরের পর বছর একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
আমাদের দেশে এমপি থেকে ইউপি মেম্বার পদে হরেক রকম প্রার্থী দাঁড়ান। কারো কারো ক্ষেত্রে দেখা যায়, শ্বশুরবাড়ি থেকে স্ত্রী অঢেল জায়গা-জমি, বা স্বর্ণালংকারের মালিক। অতচ খবর নিয়ে দেখা যায়, কারো শ্বশুর হয়তো বটতলার উকিল। শীতকালে তার বাড়িতে ডাকে কোকিল! হয়তো টিনের চালের বাড়ি। সেখানে বসে কাউয়া। হয়তো বাড়ি হতে পারে মাওয়া অথবা জাউয়া। আবার অনেক প্রার্থীর শ্বশুরের কোনকালেই তেমন বড় কোন চাকরী-বাকরি বা ব্যবসা ছিল না। কেউ হয়তো স্বল্প বেতনের কেরানী। কিন্তু ঘরে প্রতিদিন রান্না হয় পোলাও-কোরমা-বিরানী। তার মেয়েদের পোশাক আশাকে মনে হয় মহারাণী। লোভে পড়ে এই জাতীয় শ্বশুরের মেয়েদের, অনেকে করেন ঘরনী। পরে ইলেকশন এলে এর ফল বুঝেন তিনি ও বুঝে ধরণী!
অবশ্য কোন কোন মেয়ের জামাই বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির ন্যাওটা হয়ে যান। সবকিছুতেই ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’ বলে এক পায়ে চির সেবকের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। কোন কোন জামাইকে (দামান্দ) তার শ্বশুরবাড়ির কোন অবিবেচনাপ্রসূত কাজের সমালোচনা করলেই বারুদের মতো ফেটে পড়ে প্রতিবাদে। এমনকি মা-বাবা, আপন ভাইবোনের সাথে রুঢ় আচরণ করতেও লজ্জিত হয় না। সব ভুলে যায়। হয়ে যায় হিতাহিত শুন্য। অথচ নিজের রোজগারে হয়তো এই জামাই বাবুর একমাসও ঐ বিবি-বাচ্চা নিয়ে চলার ক্ষমতা নেই। এভাবে লোভী শ্বশুরবাড়ির খপ্পরে পড়ে কত মধুর পরিবারে যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। এ ধরনের জামাই বাবু প্রার্থীদের ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
এদিকে, বউ হয়তো তাকে রাখছে দৌড়ের উপর। ঘরের মধ্যে তুই-তোকারি করে নিত্য করছে ঝগড়া। সব কাজে দিচ্ছে বাগড়া। এক ঘন্টা ঘরে বসতে পারছে না বউয়ের যন্ত্রনায়। আবার বাইরে গেলে সারাক্ষণ করছে সন্দেহ। কারণ নিজ রূপগুনের অবস্থা তো নিজেই জানেন। আবার ঐ স্ত্রীর কাছেই এক পয়সার কোন গুরুত্ব নেই স্বামীর, তবে সম্পদের প্রতি অবশ্যই আছে। এ ধরনের করুন অবস্থার জামাইদেরকে দেখেছি, শ্বশুরবাড়ির জন্য একেবারে জানপ্রান। নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে অথবা নিজের মুরদ না থাকলে, প্রবাসী ভাই-বেরাদরদের কাছ থেকে ভিক্ষা করে এনে হলেও শ্বশুর পক্ষের জন্য নিজের এলাকায় জমি কেনে। শালা-শালীর জন্য বড় বড় উপহার ইত্যাদিতে টাকা-পয়সা খরচ করেন। ঐ পক্ষের বিয়েশাদীতে মোটা অংকের উপহার দিতে দরকার হলে টাকা ধার করেন কোন কোন জামাই। আখেরে এদের যে, কি হয় কামাই-ওরাই জানে!
অনেকে আবার নিজের আপন ভাই বোনদের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে, অসুরের মতো শ্বশুরবাড়ির লোকদের সাথে ঘষাঘষিতে থাকেন ব্যস্ত। মনে হয় শ্বশুরবাড়ির লোকদের জন্য জীবনটাই ন্যাস্ত। ওদের কথাই বেদবাক্য। এদের অনেকেই আবার তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত। তবে বাস্তবে দেখেছি, এ ধরনের জামাইদের করুণ পরিনতি হয় শেষ বয়সে। যাই হোক, এ ধরনের জামাই-শ্বশুর নিয়ে পরে অন্য কলামে লিখবো। আজ থাক। তবে এ ধরনের ধুরন্তর, অবিবেচক, হীন মন- মানসিকতার জামাই প্রার্থীদের কোন সুস্থ্য, বিবেকমান মানুষের ভোট দেয়া উচিত নয়। আর যারা পারিবারিক জীবনে স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে নিয়ে নিজেই সুখি নয়-এ জাতীয় প্রার্থীদের ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করবো। কারণ বহুবিধ। পরে অন্য এক কলামে ওসব নিয়ে লিখবো।
অনেক প্রার্থীর শ্বশুরের কোনকালেই হয়তো ছিল না তেমন জায়গা পৈত্রিক সম্পত্তি। এখানেই সাধারণ জনগনের আপত্তি। এখানেই যত বিপত্তি। জানিনা, নির্বাচন কমিশন কিভাবে করবে এসব ঝামেলার নিষ্পত্তি?
এ ধরনের বৈপরীত্য কেবল বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনার ফল নয়। এটি একটি পরিচিত কৌশলের পুনরাবৃত্তি। রাজনীতিতে সম্পদের হিসাব দেখানোর ক্ষেত্রে ‘স্ত্রীর নাম’ বহুদিন ধরেই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। প্রার্থী দরিদ্র হলে রাজনৈতিক সহানুভূতি জোটে, আর প্রকৃত সম্পদ থাকলে তা পরিবারের ভেতরেই সুরক্ষিত থাকে। কাগজে সব আইনসম্মত, কিন্তু বাস্তবে প্রশ্নবিদ্ধ। অনেকে আবার শালা-শালী, শালার বউ, শ্বাশুড়ি এ জাতীয় আত্মীয়ার নামে সম্পদ দেখান।
নিজের অবৈধ বা অঘোষিত সম্পদ স্ত্রীর নামে দেখিয়ে জনগণকে আর কতকাল বোকা বানাবে এরা? এই প্রশ্ন আজ আর ফিসফিস নয়, সরাসরি উচ্চারণের সময় এসেছে। কারণ যাঁরা জনগণের ভোট চাচ্ছেন, তাঁদের কাছ থেকেই যদি সত্য লুকানোর কৌশল শুরু হয়, তাহলে জনস্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি কতটা বিশ্বাসযোগ্য থাকে?
এটি কেবল ব্যক্তিগত সততা বা পারিবারিক সম্পদের প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিকতার প্রশ্ন। যাঁরা সংসদে বসে বাজেট, উন্নয়ন আর জনগণের টাকার হিসাব করবেন, তাঁদের নিজের সম্পদের হিসাবেই যদি এমন অসামঞ্জস্য থাকে, তাহলে জবাবদিহি কোথায় দাঁড়ায়?
এই হলফনামাগুলো আমাদের সমাজের আরেকটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে। সাধারণ মানুষের জন্য আইন কঠোর, কর অনিবার্য, হিসাব দিতে হয় খুঁটিয়ে। কিন্তু ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষদের জন্য হিসাব যেন কেবল কাগজের বিষয়। অর্জনকালীন মূল্য কম দেখানো, আয়ের উৎস অস্পষ্ট রাখা, সম্পদ স্থানান্তর—সবই যেন স্বাভাবিক রেওয়াজ।
সব এমপি প্রার্থী দরিদ্র, আর তাঁদের স্ত্রীরা ধনী—এই বৈপরীত্য কি আমরা মেনে নেব? নাকি এবার প্রশ্ন তুলব? ভোট দেওয়ার আগে শুধু প্রতীক বা দলের নাম নয়, এই সংখ্যাগুলোর দিকেও তাকানো দরকার। কারণ অনেক সময় নীরব সংখ্যাই সবচেয়ে জোরে সত্য বলে দেয়। আসুন সবাই মিলে এ ধরনের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকি। পাঠক, ব্যাপারটা বুঝলেন নাকি?
লেখক : সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৩ জানুয়ারি ২০২৬