কলিকালের কলধ্বনি ।। ৫৫।। রাষ্ট্রপ্রধান ধরার নামে রাষ্ট্র ধ্বংস: ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ৫৫।।
রাষ্ট্রপ্রধান ধরার নামে রাষ্ট্র ধ্বংস: ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি

ভোরের অন্ধকারে ভেনেজুয়েলার কারাকাসে যে বিস্ফোরণগুলো আঘাত হেনেছে, সেগুলো শুধু সামরিক ঘাঁটিতে নয়—আঘাত করেছে আন্তর্জাতিক আইনের বুকে, বিশ্ব বিবেকের মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ‘বড় পরিসরের হামলা’ চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে ধরে আনা হয়েছে। কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায়, কোন আইনের আওতায়—এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। আছে শুধু বিজয়ের ভঙ্গি, শক্তির প্রদর্শন।
প্রশ্ন উঠতেই হবে—আন্তর্জাতিক আইনে কি এমন কাজ বৈধ? নাকি এখন থেকে ট্রাম্পের হুকুমই হবে বিশ্বের আইন?
জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে বলে, কোনো রাষ্ট্র আরেক রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। আত্মরক্ষা ছাড়া—তাও আবার তাৎক্ষণিক ও অনিবার্য হুমকির ক্ষেত্রে। ভেনেজুয়েলা কি যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক হামলা চালাচ্ছিল? কারাকাস থেকে কি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হচ্ছিল ওয়াশিংটনের দিকে? উত্তর সবাই জানে—না।
তাহলে এই হামলার বৈধতা কোথায়?
মাদক পাচারের অভিযোগ, ক্ষমতা ছাড়ার চাপ, রাজনৈতিক অপছন্দ—এসব কি কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নেওয়ার, একটি রাজধানীতে বোমা ফেলবার, সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করার আইনি ভিত্তি হতে পারে? যদি পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন নামের যে কাঠামো এত দিন আমরা শুনে এসেছি, তা কি কেবল দুর্বলদের জন্যই?

কারাকাসের মানুষ সেই আইন বই পড়ে না। তারা জানে শুধু, ভোররাতে বিকট শব্দে ঘুম ভেঙেছে, বিদ্যুৎ নেই, আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন। ২১ বছরের এক তরুণী বলছে, “মাটি কেঁপে উঠেছিল।” এই কাঁপুনি কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের নয়—এই কাঁপুনি সাধারণ মানুষের বুকের ভেতর।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এটি ‘ন্যায়বিচার’। কিন্তু ন্যায়বিচার কবে থেকে যুদ্ধবিমান হয়ে উড়ে বেড়ায়? কবে থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হয়ে শহরের ওপর আছড়ে পড়ে? যদি কোনো শাসক অপরাধী হন, তবে তার বিচার হবে আন্তর্জাতিক আদালতে, প্রমাণের ভিত্তিতে, আইনি প্রক্রিয়ায়। বিচার নয়, অপহরণ—এটি শক্তির রাজনীতি, আইনের নয়।
আজ ভেনেজুয়েলা। গতকাল ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান। প্রতিবারই যুক্তি বদলায়, কিন্তু পদ্ধতি একই থাকে। রাষ্ট্র ভাঙে, সমাজ ভাঙে, মানুষ উদ্বাস্তু হয়। পরে ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়—‘ভুল হয়েছিল’। কিন্তু তত দিনে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায় হাজারো জীবন।
সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি এখানে—এই নজির যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে আর কোনো রাষ্ট্র নিরাপদ থাকবে? আজ যদি যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয়, “এই নেতা আমাদের পছন্দ নয়”—তাহলে কাল কে টার্গেট হবে? কোন দেশের রাজধানী?
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিরাপত্তা পরিষদ কি সত্যিই স্বাধীন? নাকি এখানেও শক্তিধরদের ভেটোই শেষ কথা? আন্তর্জাতিক আইন কি আদৌ সবার জন্য সমান, নাকি এটি কেবল কাগজে লেখা এক আদর্শ, বাস্তবে নয়?
বিশ্ব বিবেকের কাছে আজ এই প্রশ্নগুলো ছুড়ে দেওয়া জরুরি। কারণ নীরবতা মানেই সম্মতি। আজ যদি আমরা বলি, “এটা ভেনেজুয়েলার বিষয়”, কাল হয়তো বলার সুযোগই থাকবে না।
এই লেখা কোনো শাসকের পক্ষ নেওয়ার জন্য নয়। এটি কোনো সরকারের সাফাইও নয়। এটি একটি মৌলিক মানবিক প্রশ্ন—একটি রাষ্ট্র কি আরেকটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে ‘ন্যায়’ প্রতিষ্ঠা করতে পারে?
যদি উত্তর হয় ‘হ্যাঁ’, তাহলে আমাদের মানতেই হবে—বিশ্ব আর আইনের শাসনে নেই, আছে কেবল শক্তির শাসন। আর যদি উত্তর হয় ‘না’, তাহলে এই মুহূর্তেই আমাদের বলতে হবে—কারাকাসে যা ঘটেছে, তা শুধু একটি হামলা নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইনের ওপর সরাসরি আঘাত।
আজ যদি বিশ্ব চুপ থাকে, ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—তখন তোমরা কোথায় ছিলে?
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৫ জানুয়ারি ২০২৬