সুশাসনের সংকট ও অপরাধের বিস্তার: বাংলাদেশ কোন পথে যাচ্ছে? পর্ব : ৪০

সুশাসনের সংকট ও অপরাধের বিস্তার: বাংলাদেশ কোন পথে যাচ্ছে? পর্ব : ৪০

উৎসর্গ

এই কলাম উৎসর্গ করা হলো দেশের সকল নাগরিক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সচেতন দায়িত্ব, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি।

বাংলাদেশ এখন এক গভীর রাজনৈতিক রূপান্তরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে—কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা বলছে, পরিবর্তনের ঢেউ যতটা তীব্র ছিল, তার রেশ আজও প্রশাসন ও সমাজে দৃশ্যমান নয়। ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর মানুষ ভেবেছিল, দেশ নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করবে—দুর্নীতি কমবে, জবাবদিহি বাড়বে, আইনশৃঙ্খলা দৃঢ় হবে। কিন্তু এক বছর পেরোতেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি; বরং অপরাধ, মব সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত প্রতিশোধের প্রবণতা আরও বাড়ছে।

প্রতিদিন খুন হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের বাইরে

আজ বাংলাদেশে এমন কোনো দিন পাওয়া কঠিন, যেদিন খুন বা সশস্ত্র হামলার খবর পাওয়া যায় না। আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গুলি, বাড়ির সামনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা, এলাকার আধিপত্য বিস্তারের নামে রক্তপাত—সবকিছু মিলে একটি আতঙ্কিত সমাজ তৈরি হয়েছে।

যে রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা দুর্বল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক চাপের বাইরে কাজ করতে পারে না এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়—সেখানে অপরাধী চক্র মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। বাংলাদেশের পরিস্থিতি ঠিক সেই দিকেই যাচ্ছে।

মব সন্ত্রাস: রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার সবচেয়ে ভয়াবহ সংকেত

স্বৈরাচার পতনের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এক ধরনের উন্মুক্ত প্রতিশোধ-সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। কোথাও কথিত ‘চোর’ বা ‘অপরাধী’ ধরা পড়লেই তার ভাগ্যে জোটে গণপিটুনি—পুলিশ আসার আগেই লোকটি হয় মৃত, না হয় মৃত্যুপথযাত্রী।

মব জাস্টিস কখনোই হঠাৎ করে জন্ম নেয় না। এটি ঘটে তখনই, যখন জনগণ বিশ্বাস হারায়—
• পুলিশ ন্যায়বিচার দেবে না,
• আদালত দ্রুত বিচার করবে না,
• অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়ে বেঁচে ফিরবে।

একবার এই বিশ্বাস ভেঙে গেলে সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ভয়াবহ মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে। আজ বাংলাদেশ সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

কেন সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি—এবং দেরি করার সুযোগ নেই

বাংলাদেশে দুর্নীতি শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সংকট সৃষ্টি করেছে। চাঁদাবাজির মতো অপরাধ বহু বছর ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠেছে। দুর্নীতিকে শাস্তিযোগ্য, অশ্রয়যোগ্য অপরাধ না করলে অপরাধীচক্র কখনো দুর্বল হবে না।

কর্মসংস্থানহীন তরুণ জনগোষ্ঠীও অপরাধ বিস্তারের অন্যতম কারণ। কোটি কোটি তরুণ যখন অদক্ষতার চক্রে আটকে যায়, বেকারত্ব বাড়ে, তখন তাদের একটি অংশ সহজেই অপরাধী চক্রের হাতে পড়ে। শিক্ষা কাঠামো ও শ্রমবাজারের যে অনিশ্চয়তা, তা পুরো সমাজকে অস্থিতিশীল করছে।

 রাজনীতিতে জবাবদিহির অভাব

দেশের বৃহৎ অংশের মানুষ মনে করে, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি জনগণের নয়, বরং নিজেদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। সংসদ সদস্যদের অতিরিক্ত ক্ষমতা, প্রশাসনে হস্তক্ষেপ, আর্থিক অস্বচ্ছতা—এসব মিলিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সাধারণ মানুষ আর বিশ্বাস করে না।

এই অবিশ্বাসই আইনশৃঙ্খলা ভাঙনের মূলে।
যখন এমপি নিজের এলাকায় আইনশৃঙ্খলায় হস্তক্ষেপ করেন, প্রশাসন ভেঙে পড়ে এবং অপরাধীরা উৎসাহ পায়।

ভূমি দখল, নদী-খাল উচ্ছেদ—রাষ্ট্র দুর্বল হলে অপরাধ বাড়ে

বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনায় যে নৈরাজ্য চলছে, তা অপরাধ ও দুর্নীতির উৎসস্থল। খাসজমি বণ্টন, নদীদখল, পাহাড়কাটা—এসব অপরাধ একা কেউ করে না; এর পেছনে থাকে একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে কোনো সুশাসনই প্রতিষ্ঠিত হবে না।

শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ছাড়া আইনশৃঙ্খলা উন্নত হয় না

যে রাষ্ট্রে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীয়ভাবে সঞ্চালিত হয়, স্থানীয় প্রশাসন দুর্বল থাকে, নাগরিকদের সেবা পেতে হয় শহরমুখী—সেই রাষ্ট্রে অপরাধ অবশ্যই বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশন—সব পর্যায়ই প্রতিষ্ঠানগতভাবে দুর্বল।
যদি ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ না হয়, জনগণ তাদের দৈনিক প্রয়োজনীয় সেবা পাবে না এবং অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমবে না।

স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জননিরাপত্তা—দুটি জড়িত সংকট

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল হলে স্থানীয় পর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ে। কারণ অসুস্থতা, দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিরতা অপরাধ বাড়ায়। ইউনিয়ন স্তরে জিপি সিস্টেম চালু করা গেলে অন্তত স্বাস্থ্যগত দুর্বলতাজনিত সামাজিক সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে।

রাজনৈতিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়

বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে—কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন হয়নি।
স্বৈরাচার পতন শুধু একটি অধ্যায়ের শেষ; সুশাসন প্রতিষ্ঠা নতুন অধ্যায়ের শুরু।
কিন্তু সেই নতুন অধ্যায় এখনো পুরোপুরি লেখা হয়নি।

প্রতিদিন খুন হচ্ছে, মব সন্ত্রাস বাড়ছে—এটা শুধু অপরাধের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
এ দেশকে দাঁড়াতে হলে শক্ত হাতের দমন নয়—প্রতিষ্ঠানগত শক্তি, জবাবদিহি, সুশাসন ও আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে যে সংকট দাঁড়িয়ে আছে, তা কোনো দলীয় সরকারের পক্ষে একা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
সুশাসন এখন বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিক অপশন নয়; এটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার শর্ত।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক।

লন্ডন, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫