‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

প্যারিসে ছাত্রবিক্ষোভ রণক্ষেত্র, পুলিশের সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষ; আহত এক বছরের শিশু

প্যারিসে ছাত্রবিক্ষোভ রণক্ষেত্র, পুলিশের সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষ; আহত এক বছরের শিশু

ইউরোপ প্রতিনিধি, ৬ অক্টোবর:

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মঙ্গলবার আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক রাস্তায় নেমেছেন। কোথাও শান্তিপূর্ণ মিছিল হলেও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সরাসরি সংঘর্ষ, রাস্তায় আগুন, ব্যারিকেড ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। প্যারিসে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তি ও সংঘর্ষের দৃশ্যও ছড়িয়ে পড়েছে।

এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই প্যারিসের উপকণ্ঠের সাঁ-সির-লেকোলে এক বছরের একটি শিশু আতশবাজির মর্টার বিস্ফোরণে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে একটি স্কুলের কাছে শিক্ষার্থীদের অবরোধ চলার সময় ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম লে প্যারিজিয়াঁ জানিয়েছে, শিশুটি ঠেলাগাড়িতে ছিল। এ সময় এক কিশোরী মাটির কাছ দিয়ে আতশবাজির মর্টার ছোড়ে। সেটি শিশুটির ঠেলাগাড়ির কাছে বিস্ফোরিত হয়।

বিস্ফোরণের তীব্র শব্দে শিশুটির কানে শব্দজনিত সমস্যা বা টিনিটাস দেখা দেয়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের মতে, শিশুটির জীবনঝুঁকি নেই। ঘটনার পর মর্টার ছোড়ার অভিযোগে এক কিশোরীকে আটক করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে ফ্রান্সজুড়ে আন্দোলনের আকারও বড় হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দেশের বহু স্কুলে শিক্ষক সংকট তীব্র, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে এবং অনেক স্কুল ভবন দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘ স্কুল সময়, শিক্ষক অনুপস্থিতি এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকার বিরুদ্ধেও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত আন্দোলন ঘিরে ৬,১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিচার মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ১,৮০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা বা বিচারিক কার্যক্রম এগোচ্ছে। আন্দোলনে এখন পর্যন্ত ২১৫ কিশোর এবং ৭১৫ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

প্যারিসে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পাশাপাশি লিয়ঁ, স্ট্রাসবুর্গ ও রেঁনের মতো শহরেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে। কোথাও বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়েছে, কোথাও রাস্তায় আগুন জ্বালানো হয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে। তবে ফ্রান্সের সব বিক্ষোভ সহিংস ছিল না। মার্সেই, নঁতসহ বিভিন্ন শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষ শান্তিপূর্ণ মিছিলেও অংশ নিয়েছেন।

প্যারিসে মঙ্গলবার বড় বিক্ষোভে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ অংশ নিতে পারেন বলে আগে থেকেই ধারণা করা হয়েছিল। দেশটির উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংগঠনের হিসাবে, প্রায় ১,৮০০ উচ্চবিদ্যালয় অবরুদ্ধ বা দিনের জন্য বন্ধ ছিল।

আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি ঘটে সোমবার উত্তর ফ্রান্সের লঁস শহরে। সেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর হাত ও হাতের নিচের অংশ গুরুতরভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঘটনাটি পুলিশের ব্যবহৃত একটি বিস্ফোরক গ্রেনেডের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। ফরাসি পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত সংস্থা ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে।

এর আগে ট্যুর শহরে ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমের সাঁ-তুয়াঁ-লুমোন এলাকায় ১৪ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থীও পুলিশের ব্যবহৃত একটি গ্রেনেডের আঘাতে গুরুতর মুখের আঘাত পেয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠলেও কর্তৃপক্ষ বলছে, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের হামলা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতেই ব্যবস্থা নিয়েছে।

অন্যদিকে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। প্যারিসে এক নারী পুলিশ সদস্যকে কয়েকজন বিক্ষোভকারী ধাওয়া করে মাটিতে ফেলে লাথি মারার দৃশ্য প্রকাশ্যে এসেছে। বেলফোর শহরেও এক পুলিশ কর্মকর্তাকে একদল ব্যক্তি মারধর করেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্ন শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন। অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বদলি, স্কুলের দীর্ঘ সময়সূচি পর্যালোচনা, দুপুরের বিরতি বাড়ানো এবং পুরোনো স্কুল ভবন সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়ে সরকার কাজ করার কথা জানিয়েছে।

তবে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন শুধু স্কুলের সমস্যা নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। পুলিশের ভূমিকা, সামাজিক বৈষম্য, সরকারি ব্যয় এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ক্ষোভ এতে যুক্ত হয়েছে। ফলে ফ্রান্সের সরকার একদিকে শিক্ষার্থীদের দাবি মেটানোর চাপের মধ্যে রয়েছে, অন্যদিকে রাস্তায় সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সব মিলিয়ে, মঙ্গলবারের ঘটনাবলি দেখিয়ে দিয়েছে—ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন আর কেবল স্কুল অবরোধ বা শান্তিপূর্ণ মিছিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন শহরে এটি সংঘর্ষ ও সহিংসতার রূপ নিয়েছে। আর সেই সহিংসতার মধ্যে নিরীহ পথচারী, এমনকি এক বছরের শিশুও আক্রান্ত হওয়ায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।