ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
গ্রিসের কাছে অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবে ১ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ ২৫
নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৫ সেপ্টেম্বর :
ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় সমুদ্রপথে পাড়ি দেওয়া অভিবাসীদের জন্য ভূমধ্যসাগর আবারও পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের দক্ষিণে গাভদোসের কাছে অভিবাসীবাহী একটি নৌকা ডুবে অন্তত একজনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ২৫ জন। ৫১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রিসের কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, নৌকাটিতে মোট ৭৭ জন ছিলেন। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ সংখ্যা জানা গেছে। নৌকাটি লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল।
নিখোঁজদের সন্ধানে গ্রিসের কোস্টগার্ডের পাশাপাশি ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের উড়োজাহাজ, হেলিকপ্টার, টহল নৌযান ও অন্যান্য জাহাজ ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ওই এলাকায় প্রবল বাতাস থাকায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, লিবিয়া থেকে ক্রিট ও গাভদোসের দিকে যাত্রা করা নৌকায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ক্রিট ও গাভদোসে সমুদ্রপথে পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী ছিল। ওই সময়ে মোট ৮ হাজার ৫৫২ জন পৌঁছান, যার মধ্যে ৩ হাজার ৫৩৬ জন বাংলাদেশি।
শুধু চলতি বছরেই ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর একাধিক বড় ঘটনা ঘটেছে। মার্চে লিবিয়া থেকে ইউরোপের উদ্দেশে যাওয়া একটি নৌকায় খাদ্য ও পানির সংকট এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর আসে। আগস্টে আরেকটি নৌকা প্রায় ১১ দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর ৯ বাংলাদেশি ও এক সুদানি নাগরিকের মৃত্যু হয়।
এর আগের দুই বছরেও এমন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিউনিসিয়ার উপকূলে একটি নৌকাডুবিতে ৮ বাংলাদেশি মারা যান। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লিবিয়ার কাছে নৌকাডুবির ঘটনায় ২০ বাংলাদেশির মরদেহ উদ্ধার করে দাফন করা হয়েছিল বলে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। একই বছরের নভেম্বরে লিবিয়ার উপকূলে আরও ৪ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর আসে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য বলছে, ইউরোপে পৌঁছানোর পথে ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৮১২ জন এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৪০১ জন অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। অর্থাৎ শুধু এই দুই পূর্ণ বছরে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা ৭ হাজার ২১৩। চলতি ২০২৬ সালেও এখন পর্যন্ত আরও ২ হাজারের বেশি মানুষ মৃত বা নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন।
তবে এসব পরিসংখ্যানের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি মারা গেছেন, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য সরকারি বা আন্তর্জাতিক হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে নির্দিষ্ট মোট সংখ্যা দাবি করার চেয়ে নথিভুক্ত ঘটনাগুলোই বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ বাস্তবতার স্পষ্ট প্রমাণ।
বাংলাদেশিরা ইউরোপের অনিয়মিত অভিবাসনপথে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলোর একটি হয়ে উঠেছেন। ২০২৫ সালে ২৪ হাজার ৩১৮ বাংলাদেশি সমুদ্র ও স্থলপথে ইউরোপে পৌঁছেছেন বলে আইওএমের তথ্য বলছে; এর ১৬ শতাংশ গ্রিসে পৌঁছান।
অর্থাৎ ইউরোপের উন্নত জীবনের আশায় যাত্রা করা বাংলাদেশিদের একটি অংশের জন্য এই পথ এখন শুধু দালালচক্র, ঋণ ও অনিশ্চয়তার পথ নয়—অনেকের জন্য এটি হয়ে উঠছে সরাসরি মৃত্যুর যাত্রা।