কলিকালের কলধ্বনি - ৪১
১৮ কোটি মানুষের দেশ: বোঝা নয়, অপব্যবস্থাপনার শিকার
উৎসর্গ
"সেই সকল মেধাবী বাংলাদেশীর প্রতি, যারা দেশের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করছেন—বিদেশে বা দেশে।”
বাংলাদেশের কোন্ বিষয়টি নিয়ে লিখবো-কথাটা ভাবলেই নানান বিষয় একই সাথে মাথায় ভর করে। তারপর নডেচড়ে। আজকেও হয়েছে তাই। আজকের এই দিয়ে পতন হয়েছিল এরশাদ সরকার। কিন্তু এখন মনে করছি না, তাকে নিয়ে লেখা দরকার।
এই সময়ে দেশের অর্থনীতি নানা বাঁক নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু সেই পথে যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা দুঃসহ—অসাম্য, অব্যবস্থা, এবং অপূর্ণ সম্ভাবনার গল্পে ভরা। দেশের গরিব-ধনী সবাই এই অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে অবদান রাখে। তবে সেই অবদান যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে মূল্যায়ন হয় না। আমাদের উন্নয়ন মূলত তিনটি প্রধান খাতের ওপর নির্ভরশীল—বিভিন্ন পর্যায়ের ট্যাক্স, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স এবং বিদেশ থেকে আনা ঋণ সহায়তা।
একজন ভিক্ষুক থেকে শুরু করে শিল্পপতি পর্যন্ত সবাই ট্যাক্স দেয়। অথচ ভিক্ষুকের জন্য এই বোঝা অতিরিক্ত ভারী। সারা দিন অল্পটুকু অর্থ উপার্জন করে, সন্ধ্যায় ক্ষুধা মেটাতে খরচ করতে গিয়ে সে ভ্যাট দেয়। ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট ভ্যাট রাজস্বের প্রায় ২০% আসে খুচরা পণ্য থেকে, যা প্রান্তিক জনগণকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। আর বিদেশ থেকে নেওয়া ঋণ, যা ২০২৫ সালে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, তার দায় বর্তে সবাই—ছোট শিশুরও।
জনসংখ্যার দিক থেকেও বাস্তবতা কঠিন। বাংলাদেশে ১৮ কোটি মানুষের বাস, যা ঘনত্বে বিশ্বের শীর্ষে। কিন্তু জনসংখ্যা বড় হওয়ায় নয়, সুযোগের বণ্টন অসম হওয়ার কারণে এটি একটি বোঝা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানরা স্কুলে যেতে পারে না বা শিক্ষার মান এতটাই কম যে তারা মেধা বিকাশের সুযোগ হারায়। ফলে আমাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাময় মানুষ—যেমন ভবিষ্যতের ব্যাংক গভর্নর বা বড় অর্থনীতিবিদ, সচিব, বা রাজনীতিবিদ —পেছনে পড়ে যায়। UNESCO-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে প্রান্তিকদের অন্তর্ভুক্তি মাত্র ৬৫%।
উদ্যোক্তাদের পরিস্থিতি আরও করুণ। জমি কেনার প্রক্রিয়া, লাইসেন্সিং, জটিল প্রশাসনিক ধাপ—সবই সময় ও অর্থের ক্ষতি করে। কারখানা বা ব্যবসা স্থাপন করতে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে দশ বছরেরও বেশি সময় লাগে। ফলে ব্যাংক ঋণ নিলে তা ‘মন্দ ঋণ’ বা NPA হয়ে যায়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্টে দেখা গেছে, মোট লোনের প্রায় ৮% এমপিএল হয়ে গেছে, যার বড় অংশই ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের। এ অবস্থায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বারবার দেশে আসতে অনীহা দেখান। কারণ তারা বলছেন, “আপনার দেশ স্থির নয়, লালফিতার দৌরাত্ম্য আছে, আমার জীবন ও টাকার নিরাপত্তা নেই।”
দুর্নীতি সমাজের সর্বত্র। এমনকি মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন নিয়োগেও লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া যায়। Transparency International-এর ২০২৫ সালের সূচকে বাংলাদেশ ১৭৮টি দেশের মধ্যে ১৪৫তম অবস্থানে, যা আমাদের অবস্থার দুঃখজনক চিত্র ফুটিয়ে তোলে। ফলে দেশের মেধাবীরা বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে বাধ্য হয়। দেশে ফিরতে তারা চায় না—কারণ দেশে নেই সম্মানজনক, নিরাপদ ও স্বচ্ছ পরিবেশ। সুতরাং এক্ষেত্রে এসব লাখ লাখ তরুণদের দোষ দিয়ে লাভ নেই।
তবে পরিবর্তনের পথ আছে। আমাদের দৃষ্টি তিনটি ক্ষেত্রে হওয়া দরকার:
১. শিক্ষা: শুধুমাত্র সার্টিফিকেট নয়, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি যেন একেকটি সম্পদ। কৃষক হোক বা উদ্যোক্তা, প্রত্যেকের দক্ষতা বাড়াতে হবে। জাপানের উদাহরণ সামনে রেখে বলা যায়, ঘরে ঘরে কারখানা তৈরি করা সম্ভব।
২. দুর্নীতি দমন: সারা সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রশাসনিক সংস্কার, স্বচ্ছতা, এবং সিস্টেম উন্নত করতে হবে। দুর্নীতি দমন করলে ব্যবসায়ীরা নিরাপদে বিনিয়োগ করতে পারবে।
৩. ন্যায়বিচার: সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি, শিক্ষা—সবই ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পরিচালিত হলে দেশে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। আমরা যদি একসাথে কাজ করি, মেধা, শ্রম ও সম্পদকে কার্যক

রভাবে ব্যবহার করি, তবে বাংলাদেশকে স্বপ্নের দেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। দেশ শুধুই জন্মস্থান নয়, এটি আমাদের দায়িত্বও। ক্রমশ হলেও যৌক্তিক পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারব। একবার শপথ নিন—দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য, ন্যায়, শিক্ষা ও সততার পথে।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা অশেষ। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে শুধু আশা নয়, প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা, দৃঢ় সংকল্প ও সমাজের সকল স্তরের অংশগ্রহণ। একসাথে হলে আমরা পারব—এটাই নিশ্চিত।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫