কলিকালের কলধ্বনি ।।৫৭।। আশা ছিল দেশটা হবে পরীস্থান: এখন দেখছি হচ্ছে গোরস্থান !
কলিকালের কলধ্বনি ।।৫৭।।
আশা ছিল দেশটা হবে পরীস্থান: এখন দেখছি হচ্ছে গোরস্থান !
প্রিয় জন্মভূমি আমাদের বাংলাদেশ। এক সময় খুন ছিল ব্যতিক্রম, এখন খুন নিয়ম সেখানে। এক সময় মানুষ ভয়ে আঁতকে উঠত, এখন ভয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এই অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া ভয়ই একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে অশুভ লক্ষণ। কারণ যখন নাগরিক খুন, ধর্ষণ, মব সন্ত্রাসকে ‘স্বাভাবিক’ ধরে নিতে শেখে—তখন রাষ্ট্র কার্যত তার নৈতিক কর্তৃত্ব হারায়। ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর সবাই ভেবেছিল দেশে দুধের আর মধূর নহর বইতে শুরু করবে। আর শান্তিতে নোবেলজয়ীর সোনার কাঠির ছোঁয়ায় দেশটা শান্তিতে ভরে উঠবে। আসবে বিনিয়োগ, সৃষ্টি হবে হাজার হাজার কর্মসংস্থান। দেশটা হবে পরীস্থান। এখন মনে হচ্ছে দেশটা হয়ে যাচ্ছে গোরস্থান। তাহলে দেশটা কেমনে হবে শান্তির বাসস্থান?
দেশে প্রতিদিন খুন হচ্ছে ১০-১৫ জন করে মানুষ। সরকারের এদিক দিয়ে নেই কোন হুশ। আইন শৃংখলা বাহিনী মনে হয় বেহুশ। সরকারী তরফে বলা হয় এসব খুন নাকি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আসলে যার সন্তান মরছে সেই বুঝে যাতনা। গেল ২০২৫ সালের পুরো বছরজুড়ে হয়েছে খুন আর হত্যা। এদিকে সড়ক দূর্ঘটনা, নানা অপঘাতে মৃত্যু তো হর-হামেশা ঘটেই চলেছে। এদিকে সামনে ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ অবস্থায় আজ আর প্রশ্ন করছে না—নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না। প্রশ্ন করছে আরও নির্মমভাবে—এই নির্বাচনের সময় কতজন মানুষ খুন হবে?
এই প্রশ্ন কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর জমে ওঠা এক গভীর জাতীয় উদ্বেগ। পরিসংখ্যান সেই উদ্বেগকে নির্মমভাবে সত্য প্রমাণ করছে।খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ১ লাখ ৮১ হাজার ৭৩৭টি অপরাধ মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে খুন ৩ হাজার ৭৮৫টি। শুধু খুন নয়—নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ২১ হাজার ৯৩৬টি, চুরি ১২ হাজার ৭৪০টি, দস্যুতা ১ হাজার ৯৩৫টি, ডাকাতি ৭০২টি, অপহরণ ১ হাজার ১০১টি, পুলিশের ওপর হামলা ৬০১টি। এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো সংখ্যার খেলা নয়—এগুলো একটি ভেঙে পড়া জননিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।
আর এই ভাঙনের সবচেয়ে বড় শিকার নারী ও শিশু। ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি যে অপরাধটি ঘটেছে, তা হলো নারী ও শিশু নির্যাতন। রাজধানী ঢাকাতেই অন্তত এক হাজার শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। চার বছর বয়সী রোজা মণির মতো শিশুকে গরম পানি ঢেলে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়—এমন নৃশংসতা কোনো সভ্য রাষ্ট্রে কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে তা ঘটেছে, আলোচনায় এসেছে, তারপর ধীরে ধীরে ভুলে যাওয়া হয়েছে।
মূলত গণ-অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়াই এই অপরাধ বিস্ফোরণের মূল কারণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক স্পষ্ট করে বলেছেন—আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। নারী এখনো দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, শিশুদের আইনি সুরক্ষা কাগজেই সীমাবদ্ধ।
এই দুর্বলতার সুযোগেই মাথাচাড়া দিয়েছে আরেকটি ভয়ংকর বাস্তবতা—মব সন্ত্রাস। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মব সহিংসতায় ১৮৪ জন নিহত হয়েছেন। তুলনা করলে চিত্র আরও ভয়াবহ হয়। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৮, ২০২২ সালে ৩১, ২০২৩ সালে ৪৯। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে মব হত্যার সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে।
মব মানে কী? মব মানে রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারানো মানুষ। যখন নাগরিক মনে করে—আইন কাজ করবে না, পুলিশ আসবে না, বিচার হবে না—তখন সে নিজেই বিচারক হয়ে ওঠে। মব সন্ত্রাস আসলে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার গণপ্রকাশ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের ভয়াবহ অধ্যায়। গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের ৪৬০টির বেশি থানায় হামলা চালিয়ে ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র লুট করা হয়। সাত মাস পরও এখনো ১ হাজার ৩৩৩টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এই অস্ত্রগুলো ছড়িয়ে পড়েছে কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাসী, চরমপন্থিদের হাতে। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই অপরাধীদের হাতে প্রাণঘাতী শক্তি তুলে দিয়েছে।
কিশোর অপরাধের চিত্রও উদ্বেগজনক। বৈশ্বিক কিশোর অপরাধ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বাদশ। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে। একাধিক অভিযানের পরও তারা বারবার সংগঠিত হচ্ছে—যা প্রমাণ করে, সমস্যার মূল সমাধান হয়নি।
এই বাস্তবতায় সরকারের ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’, গ্রেপ্তার সংখ্যা কিংবা আশ্বাস মানুষকে আর আশ্বস্ত করছে না। কারণ প্রশ্ন একটাই—অভিযানের পরও কেন প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা সম্ভব হয়? কেন নারীকে খুঁটিতে বেঁধে নির্যাতন করা যায়? কেন আইনজীবী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী কেউই নিরাপদ নয়?
আর এই অবস্থাতেই সামনে জাতীয় নির্বাচন।
ইতিহাস বলে, বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই সহিংসতা। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আলাদা। কারণ দেশ ইতিমধ্যেই সহিংসতায় জর্জরিত। ফলে আশঙ্কা এখন আর সম্ভাবনা নয়—এটা প্রায় নিশ্চিত বাস্তবতা।
এই মুহূর্তে সরকারের করণীয়: আর দেরি মানেই আরও রক্ত
এই অবস্থায় সরকার যদি সত্যিই রাষ্ট্র চালাতে চায়, তবে এখনই কিছু কঠোর ও দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এক. মব সন্ত্রাসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিটি মব হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার ও প্রকাশ্য শাস্তি না হলে এই সহিংসতা থামবে না।
দুই. লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারকে জাতীয় জরুরি ইস্যু ঘোষণা করতে হবে।
নির্বাচনের আগে একটি অস্ত্রও যেন অপরাধীদের হাতে না থাকে—এটাই হতে হবে লক্ষ্য।
তিন. রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধ দমন করতে হবে।
‘আমাদের লোক’ সংস্কৃতি বন্ধ না হলে আইনশৃঙ্খলা ফেরানো অসম্ভব।
চার. নির্বাচনকালীন বিশেষ নিরাপত্তা কাঠামো এখনই ঘোষণা করতে হবে।
কোথায় কীভাবে নিরাপত্তা থাকবে—এই স্বচ্ছতা না থাকলে আতঙ্ক আরও বাড়বে।
পাঁচ. সরকারকে স্বীকার করতে হবে—পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়।
সমস্যা স্বীকার না করলে সমাধানও আসে না।
আজ বাংলাদেশ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, সেখানে নির্বাচন শুধু ক্ষমতার প্রশ্ন নয়—এটা মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। ইতিহাস একদিন হিসাব নেবে—এই সংকটের সময় কে দায়িত্ব নিয়েছিল, আর কে চোখ বন্ধ করে ছিল।
জাতি আজ ভোটের হিসাব করছে না।
জাতি আজ হিসাব করছে—আর কত লাশ দেখার মানসিক প্রস্তুতি আমাদের আছে।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১০ জানুয়ারি ২০২৬